ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আনুষ্ঠানিক মেয়াদ শেষ হয়েছে। তেহরান অবশ্য এটিকে যুদ্ধ বা হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনার ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার সাংবাদিকদের জানান, চাপ, হুমকি বা সময়সীমার ভিত্তিতে ইরান কোনো বিষয়ে নীতিনির্ধারণ করে না। জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে তিনি স্পষ্ট করেন। হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়নি। এর পেছনে আইনি ও কারিগরি জটিলতা, আলোচনায় একাধিক পক্ষের সম্পৃক্ততা এবং প্রক্রিয়াটি ব্যর্থ করতে চাওয়া কিছু পক্ষের ভূমিকা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আইআরজিসির রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি সোমবার অন্য একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র জুনের সমঝোতা স্মারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না।

এদিকে, সম্ভাব্য স্থল অভিযানের মোকাবিলায় ইরান আরও আক্রমণাত্মক যুদ্ধকৌশলের দিকে ঝুঁকছে। এই কৌশলগত পরিবর্তনের পেছনে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোর ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে তিনি আইআরজিসির কয়েকজন কর্মকর্তা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও নিরাপত্তা পদে নিয়োগ দেন। আইআরজিসির নতুন কমান্ডার-ইন-চিফ মেজর জেনারেল আহমাদ ওয়াহিদির দায়িত্ব গ্রহণের সময় খামেনি বলেন, শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযানের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। ওয়াহিদি বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর যে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছিল, তাতে ইরানের নেতৃত্ব ও সশস্ত্র বাহিনী বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি অস্ত্রসজ্জিত সেনাবাহিনীকে নতজানু করতে সক্ষম হয়েছে।

জাভানি গত রোববার রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, তাঁর বাহিনী দেশের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণে প্রস্তুত রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন, সংঘাতের সূচনা প্রতিপক্ষের দিক থেকেই হয়েছে। এতদিন ইরানের ভূমিকা ছিল প্রতিরক্ষামূলক। এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসে আরও আক্রমণধর্মী পথ অবলম্বনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, তা বিস্তারিত জানাননি তিনি। তবে প্রতিপক্ষকে কৌশলগতভাবে অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপের জন্য সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। গত মাসে আবার সংঘাত শুরু হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি কার্যত ভেঙে পড়েছে। গত সপ্তাহে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেছিলেন, ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন জায়গায় পাল্টা হামলা চালানো হতে পারে।

ইরানের কট্টরপন্থী রাজনীতিক ও সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালালে জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় স্থল অভিযান চালাতে পারে তেহরান। তবে বিশ্লেষকেরা এ ধরনের অভিযানের বাস্তবায়ন ও ঝুঁকি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন দ্বীপ ও উপকূলীয় এলাকা রক্ষায় আলাদা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে বলে সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপও রয়েছে। হরমুজ প্রণালির আশপাশের ইরানি ভূখণ্ডে সেনা মোতায়েন বাড়ানো হয়েছে। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ-রেজা আকরামিনিয়া গত সপ্তাহে বলেন, ইরানের লক্ষ্য হবে কোনো বিদেশি সেনাকে দেশের ভূখণ্ডে নামতে না দেওয়া। তিনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, মার্কিন সেনারা আমাদের কোনো একটি দ্বীপে ঢুকলে আমরা সেই দ্বীপেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করব।

ইরানের পশ্চিম সীমান্তে ইরাক ও তুরস্কের কাছে এবং পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কাছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কাও জানিয়েছে তেহরান। ইরাকের কুর্দিস্তানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আইআরজিসি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে স্থল অভিযান চালানোর কথা ভেবেছিল। তবে অপরিপক্ব পরিকল্পনার কারণে শেষ পর্যন্ত তা করেনি। তিনি বলেন, জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড তেহরান বা উত্তর ইরানে হামলা না চালিয়ে ১৫টি প্রদেশের প্রায় ৫০টি শহরে হামলা চালায়। তাঁর ধারণা, এসব বিমান হামলার উদ্দেশ্য ছিল স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া, এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা করা। তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ ইরানে সামরিক সরবরাহ বন্ধ করতে সেতু, সড়ক, সমুদ্র নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, রাডার, উপকূলীয় স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালি স্থল অভিযানের জন্য ৪০ থেকে ৫০ হাজার সেনা যথেষ্ট নয়, অন্তত এক লাখ সেনা আনতে হবে। তাদের জাগরোস পর্বতমালা পেরিয়ে ফার্স প্রদেশের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার দাবি করেছেন, যুদ্ধে ইরান পরাজিত হয়েছে এবং দেশটি নৌ অবরোধের মুখে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালিকে খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করা হবে। ওমানের মুসান্দাম থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের দৃশ্য প্রকাশের পর হোয়াইট হাউস জানায়, ট্রাম্প নিছক কৌতুক করে ওই মন্তব্য করেছিলেন। তবে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি ওই মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান চালানোর পর কেউ কোনো মার্কিন সেনাকে হত্যা বা আটক করতে পারলে তাঁকে ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে। কোনো নারী এ কাজ করতে পারলে তাঁকে দেওয়া হবে দ্বিগুণ পুরস্কার। সম্প্রতি জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানের হামলার প্রসঙ্গ টেনে হাতামি বলেন, যারা ইরানে হামলা চালাবে, তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা আমাদের আছে। ভবিষ্যতে সেই সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করা হবে।

ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান রাজনৈতিক ও সামরিক—দুই দিক থেকেই বিজয়ী হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা তাদের সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছি—এমন কথা বলছি না। আমি বলতে চাইছি, তারা ৯টি লক্ষ্য স্পষ্টভাবে ও বারবার উল্লেখ করে আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু কোনোভাবেই সেসব লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য এটিই ছিল সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। তবে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সমাধানে ইরানের নেতৃত্বকে এখনো রাজি করাতে পারেননি তিনি। স্থবিরতার মধ্যে সপ্তাহান্তে কয়টি জাহাজ হরমুজ পাড়ি দিয়েছে।