চীনের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে প্রতিযোগিতার মধ্যে এবার বিভিন্ন দেশকে স্পষ্টভাবে এক পক্ষ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানানোর উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রয়টার্সের হাতে আসা ট্রাম্প প্রশাসনের একটি অভ্যন্তরীণ খসড়া চিঠি থেকে জানা গেছে, বেইজিংয়ের নেতৃত্বাধীন কোনো এআই উদ্যোগে অংশ নিলে সেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে চলে যেতে পারে। খসড়ায় এই সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, "সবকিছুর অংশ হওয়ার অর্থ কোনো কিছুরই অংশ না হওয়া। প্যাক্স সিলিকা ঘোষণায় সই করা মানে শুধু সদস্য হওয়া নয়, এটি একটি প্রতিশ্রুতি।" খসড়া চিঠিতে সরাসরি চীনের নাম না থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সমান্তরাল জোটে যুক্ত থেকে এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সম্ভব নয় বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। গত জুনে 'এআই অপরচুনিটি স্টেটমেন্ট' নামে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে সই করা ৩৫টি দেশের কাছে এই চিঠি পাঠানো হবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে। এসব দেশের মধ্যে প্যাক্স সিলিকার সদস্যরাও আছেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআই নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। অত্যাধুনিক এআই তৈরির দৌড়ে চীনকে প্রয়োজনীয় সম্পদ থেকে বঞ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। ওয়াশিংটন মনে করে, সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গত বছর 'প্যাক্স সিলিকা' নামের একটি উদ্যোগ চালু করে যুক্তরাষ্ট্র। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, এআই মডেল ও সেমিকন্ডাক্টর চিপের সরবরাহব্যবস্থা নিরাপদ করাই এর লক্ষ্য। কাজাখস্তানসহ প্রায় ২৪টি দেশ এই জোটে রয়েছে। অন্যদিকে, গত জুলাইয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং 'ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন' (ডব্লিউএআইসিও) নামে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থা গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই খাতে মার্কিন প্রভাব মোকাবিলায় চীন তাদের প্রযুক্তি ও সহযোগিতার কাঠামো সম্প্রসারণ করছে। এখন পর্যন্ত কাজাখস্তানই একমাত্র দেশ, যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উভয় উদ্যোগেই যোগ দিয়েছে, যা ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, কোনো দেশ একই সঙ্গে চীনের নেতৃত্বাধীন এআই জোটে যোগ দিয়ে কীভাবে তাদের ইকোসিস্টেমের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের দাবি করতে পারে, তা বোঝা কঠিন। চিঠিটি কবে পাঠানো হবে বা পাঠানোর আগে এতে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, সে বিষয়ে রয়টার্স কিছু নিশ্চিত করতে পারেনি। খসড়াটিতে কোনো তারিখও দেওয়া হয়নি। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, তারা বাণিজ্য ও প্রযুক্তি ইস্যুকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার বিরোধী। দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, এমন পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে এআইয়ের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করবে এবং কারও স্বার্থ রক্ষা করবে না। কাজাখস্তানের দূতাবাসও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এই লড়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো মার্কিন কোম্পানির মালিকানাধীন ব্যবস্থার বিপরীতে চীনের 'ওপেন-ওয়েট' এআই মডেলগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। 'ওপেন-ওয়েট' মডেলের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত প্যারামিটার বা 'ওজন' ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে, ফলে সেগুলো ডাউনলোড করে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার বা পরিবর্তন করা যায়। স্বয়ংক্রিয়ভাবে হ্যাক করার সক্ষমতাসহ এআইয়ের ক্ষমতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এর শক্তি ও ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। বেইজিং তাদের শীর্ষস্থানীয় কিছু এআই মডেলে বিদেশিদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার কথাও ভাবছে, যা চীনের কঠোর জাতীয় নিরাপত্তানীতির প্রতিফলন। গত জুনে কাজাখস্তান প্রথম মধ্য এশীয় দেশ হিসেবে প্যাক্স সিলিকায় যোগ দিলে যুক্তরাষ্ট্র এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখে। দেশটির কাছে উন্নত প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদের বিশাল ভান্ডার রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা শুল্কযুদ্ধের জবাবে চীন তাদের খনিজ সম্পদের ওপর আধিপত্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের দেশে এবং মিত্রদের কাছ থেকে এসব খনিজ সংগ্রহের চেষ্টা জোরদার করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, প্যাক্স সিলিকার সদস্যরা এআই-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ পায়। আর এআই অপরচুনিটি স্টেটমেন্টে সই করা দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে 'অভিন্ন লক্ষ্য' ও 'ভবিষ্যৎ ভাবনা'র বিষয়ে প্রতীকীভাবে একমত হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, 'একই সঙ্গে দুই দিকে থাকতে পারবে না'—দেশগুলোকে এটি স্পষ্ট করে দিতেই চিঠিটি খসড়া করা হয়েছে।