বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী প্রতিটি পাঁচজন তরুণের মধ্যে একজন পড়াশোনা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নন। তরুণদের নিয়ে আলোচনায় বারবার উঠে আসছে একটি প্রশ্ন—আমরা কি প্রজন্মকে সক্ষমতা দিয়ে গড়ে তুলছি, নাকি কেবল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করছি? একদিকে প্রতিবছর লাখো শিক্ষার্থী বিভিন্ন স্তরের সনদ নিয়ে বের হচ্ছে, কিন্তু সেই সনদের সঙ্গে কাজের কোনো মিল নেই। অন্যদিকে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো খুঁজছে দক্ষ কর্মী, আর আমাদের তরুণদের ভাষাগত ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে তাদের চাহিদার অমিল প্রকট। ফলে কর্মসংস্থানের সংকট দিন দিন গভীর হচ্ছে।
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় উচ্চমাধ্যমিক পেরোনো অনেক শিক্ষার্থীর বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান অত্যন্ত দুর্বল, যদিও সরকার সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—শিক্ষাব্যবস্থা কি সত্যিই চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তরুণদের জ্ঞান ও দক্ষতা দিচ্ছে? প্রায় ১২ বছর ইংরেজি শেখার পরও সিংহভাগ শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে কথা বলতে পারে না। অর্থাৎ ভাষা শেখানো হচ্ছে সাহিত্যের গণ্ডিতে আবদ্ধ, ব্যবহারিক দক্ষতায় নয়।
সমস্যাটি শুধু শিক্ষাব্যবস্থার নয়, সামাজিক মানসিকতারও। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান ন্যানইয়াং পলিটেকনিক ও ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল এডুকেশন (আইটিই) পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা এ প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক। সেখানে বায়োমেডিকেল, অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকাট্রনিকস, রোবোটিকস, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন, হর্টিকালচার, অপ্টোমেট্রি, লাইভ ইভেন্ট, ইলেকট্রনিকস ও কম্পিউটার সায়েন্সের মতো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরের নীতিমালা অনুযায়ী, দশম শ্রেণি শেষে ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য এগোতে পারে মাত্র ৩০ জন। বাকি ৭০ জনকে পরিকল্পিতভাবে কারিগরি শিক্ষার দিকে পরিচালিত করা হয়। সেখানে ধনী-দরিদ্র বা সামাজিক মর্যাদা কোনো বাধা নয়, কারণ শ্রমবাজারের চাহিদাই এমন। পাঁচটি ন্যানইয়াং পলিটেকনিক ও তিনটি আইটিই ক্যাম্পাসের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্বমানের কারিগরি শিক্ষা পায় এবং দক্ষতা অর্জনের পরপরই তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়। অফিস কর্মকর্তা ও দক্ষ পেশাজীবীদের মধ্যে বেতন বা মর্যাদার তেমন ব্যবধান নেই, তাই কারিগরি শিক্ষায় তাদের আগ্রহ অটুট থাকে।
বাংলাদেশে অবশ্য কারিগরি শিক্ষা মানেই এখনো অনেকের কাছে হাতুড়ি-বাটাল দিয়ে কাজ করা। রাজমিস্ত্রি বা প্লাম্বারের কাজকে স্থায়ী পেশা হিসেবে দেখা হয় না, ফলে প্রশিক্ষণের প্রতি আগ্রহ কম। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থাও ভাতানির্ভর ও বিনা মূল্যের প্রশিক্ষণকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে, যা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি, গ্রাফিক ডিজাইন, বেকারি ও পেস্ট্রি, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ সার্ভিস, ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন, হাউসকিপিং, কেয়ারগিভিং, এমনকি দক্ষ গাড়িচালকেরও চাহিদা বাড়ছে। এআই ও মেশিন লার্নিংয়ের কারণে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার চাহিদা আরও দ্রুত বাড়ছে।
জাপান, জার্মানি ও ইউরোপের অনেক দেশ জন্মহার হ্রাস এবং জনসংখ্যা বার্ধক্যজনিত কারণে কর্মক্ষম মানুষের সংকটে ভুগছে। ফলে তারা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে দক্ষ জনশক্তির জন্য। অথচ আমাদের দেশে অনেক পরিবার সারা জীবনের সঞ্চয় সন্তানের পড়াশোনায় ব্যয় করে, কিন্তু একের পর এক সনদ পাওয়ার পরও চাকরি না হওয়ায় সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। আন্তর্জাতিক ধারণা হলো, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করলে একজন মানুষ মৌলিক সাক্ষরতা, সংখ্যাজ্ঞান ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা পায়। এরপর কর্মসংস্থানের জন্য কেউ কারিগরি বা দক্ষতা প্রশিক্ষণ নিতে চাইলে তাকে স্বাগত জানাতে হবে। সবাইকে একই শিক্ষার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে তোলা জরুরি নয়; বরং নির্দিষ্ট পর্যায়ে গিয়ে শিক্ষার্থীকে উপযুক্ত পথে পরিচালিত করা দরকার।
ব্র্যাকের একটি উদ্যোগে সিঙ্গাপুরে নির্মাণশিল্পে এনহান্সড অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্কের দক্ষ কর্মী পাঠানো হয়েছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) সঙ্গে যৌথভাবে কারিকুলাম তৈরি করে তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা আগে বাংলাদেশে ছিল না। তবে দেখা গেছে, অনেক মাস্টার্স পাস তরুণও সঠিক দক্ষতা না থাকায় আবেদন করতে পারছে না। এ বছর এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ এইচএসসি পরীক্ষায় বসেনি। জাতীয় পর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে মানবসম্পদ পিরামিড গড়ে তোলা জরুরি, যার ভিত্তিতে থাকবে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মী। কিন্তু বর্তমানে পিরামিডটি উল্টে গেছে—সবাই অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে ডেস্ক জব খুঁজছে, যা কোনো অর্থনীতির পক্ষেই সম্ভব নয়। ফলে যোগ্যতার সমান চাকরি না পেয়ে তরুণরা হতাশায় ভুগছে, যা আন্ডার এমপ্লয়মেন্ট নামে পরিচিত।
অষ্টম বা নবম শ্রেণিতে গিয়ে শিক্ষার্থী ও তার পরিবার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ঠিক করলে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সেই লক্ষ্যে নিজেকে প্রস্তুত করা সম্ভব। দক্ষতা থাকলে দেশে সুযোগ সীমিত হলেও বিশ্ব বাজার উন্মুক্ত। এজন্য সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি অতিরিক্ত একটি ভাষা শেখা প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী আগেই ঠিক করলে সে জাপানে যাবে নাকি জার্মানিতে, সে অনুযায়ী তৃতীয় ভাষাটি বেছে নিতে হবে। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে বলা যায়, প্রতিটি দেশই এমন কর্মী চায় যারা তাদের ভাষায় যোগাযোগ করতে পারে এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বোঝে। তবে বাংলাদেশে অনেক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্বীকৃত ভাষা প্রশিক্ষক ছাড়া ভাষা শিক্ষা দিচ্ছে। জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণে অর্ধেকেরও কম শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হচ্ছে, আবার উত্তীর্ণদের অনেকেই কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষায় পাস করলেও কথোপকথনে দুর্বল।
অনেকে মনে করেন অনলাইনে ভাষা শেখা যায় না, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিএমইটির উদ্যোগে জাপান থেকে স্বীকৃত প্রশিক্ষক অনলাইনে ক্লাস নেন, আর শ্রেণিকক্ষে থাকেন বাংলাদেশি সহকারী। এতে ফলাফল ভালো হয়। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব স্কিলস ডেভেলপমেন্ট কেয়ারগিভিং সেবার জন্য দক্ষতা ও ভাষা-সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি নিয়ে মানবসম্পদ তৈরি করছে এবং ব্র্যাক প্রবাসবন্ধু লিমিটেডের মাধ্যমে জাপানে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, দক্ষতা, তৃতীয় ভাষা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি—এই চারটি বিষয় মিলিয়েই পূর্ণাঙ্গ মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্ভব। এক কোটির বেশি প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে অনেকেই দক্ষতা প্রশিক্ষণ নিয়ে সচ্ছল জীবনযাপন করছেন, কেউ কেউ উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করছেন। এসব সাফল্যের গল্প মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে। সবাই ডেস্কে বসে কাজ করার সুযোগ পাবে না, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে কারিগরি কাজের স্বীকৃতি নেই বা ভালো আয়ের উৎস নেই। বিশ্ববাজার আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত, তাই গতানুগতিক ধারণা ভেঙে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে নিজের, পরিবার ও সমাজের স্বার্থে।




