পাই—এই একটি মাত্র সংখ্যা ঘিরে গণিতের জগতে যত রহস্য, সম্ভবত আর কোনো সংখ্যাকে ঘিরে নেই। বৃত্তের পরিধিকে ব্যাস দিয়ে ভাগ করলে যে মান পাওয়া যায়, সেটিই পাই। কিন্তু এই মানটি কখনো শেষ হয় না, দশমিকের পর অসংখ্য সংখ্যা এলোমেলোভাবে চলতেই থাকে। কেন এমন হয়, কেন পাইকে অমূলদ বলা হয়—তা নিয়েই এই আলোচনা।
শুরুতে একটি গল্প বলি। বান্টি নামের এক ছেলে এক নভোযানে আটকে পড়ে। পালানোর জন্য পাসওয়ার্ড প্রয়োজন। স্ক্রিনে ক্লু দেওয়া আছে—বৃত্তের পরিধিকে ব্যাস দিয়ে ভাগ করলেই পাসওয়ার্ড পাওয়া যাবে। বান্টি প্রথমে ২২/৭ লিখে ভুল পাসওয়ার্ডের সিগনাল পায়। এরপর ৩.১৪ বসিয়েও ব্যর্থ হয়। পরে সে বুঝতে পারে, আসল মানটি ৩.১৪১৫৯...—এভাবে চলতেই থাকে, কোনো শেষ নেই। সংখ্যাগুলোর মধ্যে কোনো প্যাটার্নও নেই। আসলে পাইয়ের মান কখনো শেষ হওয়ার নয়, কারণ এটি অমূলদ।
পাই মূলত কী? খুব সহজভাবে বললে, যেকোনো বৃত্তের পরিধিকে তার ব্যাস দিয়ে ভাগ করলে যে সংখ্যা পাওয়া যায়, সেটাই পাই। যেমন, একটি সাইকেলের চাকার পরিধি যদি ৩১.৪ সেন্টিমিটার এবং ব্যাস ১০ সেন্টিমিটার হয়, তাহলে ভাগফল ৩.১৪। কিন্তু এখানেই সমস্যা—এই ভাগফলটি কখনো নিখুঁতভাবে প্রকাশ করা যায় না।
স্কুলে সাধারণত শেখানো হয় পাইয়ের মান ২২/৭। কিন্তু এটি আসলে পাই নয়, এটি শুধুই কাছাকাছি একটি মান। ২২/৭ = ৩.১৪২৮৫৭১৪২৮৫৭...—এখানে দশমিকের পর ১৪২৮৫৭ পুনরাবৃত্তি হয়। অথচ আসল পাই শুরু হয় ৩.১৪১৫৯২৬৫৩৫... দিয়ে। প্রথম দুই ঘর মিলে যাওয়ায় ছোটখাটো হিসাবে ২২/৭ চললেও, মহাকাশযান পাঠানোর মতো নিখুঁত হিসাবে তা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
মূলদ সংখ্যা হলো সেই সংখ্যা, যাকে দুটি পূর্ণসংখ্যার ভগ্নাংশ হিসেবে লেখা যায়, যেমন ১/২, ৩/৪। এদের দশমিক মান হয় সসীম, অথবা নির্দিষ্ট ছন্দে পুনরাবৃত্ত হয়। কিন্তু অমূলদ সংখ্যা হলো একদম বুনো ঘোড়ার মতো—এদের দশমিক মান কখনো শেষ হয় না, আবার পুনরাবৃত্তিও হয় না। পাই হলো এই অমূলদ সংখ্যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
প্রশ্ন হলো, পরিধি ও ব্যাস তো বাস্তব জিনিস, তাহলে এদের ভাগফল কেন ভগ্নাংশে প্রকাশ করা যায় না? আসলে বৃত্তের ব্যাসকে যদি পূর্ণসংখ্যা বানানো হয়, তবে পরিধি আর পূর্ণসংখ্যা থাকে না; আর পরিধিকে পূর্ণসংখ্যা বানালে ব্যাস ভগ্নাংশ হয়ে যায়। এ যেন এক অনন্ত লুকোচুরি খেলা।
১৭৬১ সালে সুইস গণিতবিদ জোহান ল্যাম্বার্ট প্রমাণ করেন পাই অমূলদ। তিনি দেখান, যদি পাই/৪ মূলদ হতো, তাহলে একটি বিশেষ সমীকরণে তা বসালে ফল আসত ১—একটি মূলদ সংখ্যা। কিন্তু সেই সমীকরণের নিয়ম অনুযায়ী, মূলদ সংখ্যা ঢুকালে অমূলদ ফল বের হওয়ার কথা। যেহেতু ফল ১ মূলদ, তাই শুরুতে অনুমানটি ভুল ছিল। অর্থাৎ পাই/৪ অমূলদ, ফলে পাইও অমূলদ।
পাই কি তবে এলোমেলো সংখ্যা? একদমই না। মহাবিশ্বের যেকোনো জায়গায় গেলেই বৃত্তের পরিধি-ব্যাসের অনুপাত একই—৩.১৪১৫৯২৬৫...। সমস্যা শুধু আমাদের সংখ্যা পদ্ধতির, যার মাধ্যমে পাইকে পুরোপুরি লেখা সম্ভব নয়। নদীর বাঁক, আলোর তরঙ্গ, শব্দের কম্পন, এমনকি ডিএনএর গঠনেও পাই লুকিয়ে আছে। বিজ্ঞানীরা সুপারকম্পিউটার দিয়ে পাইয়ের মান দশমিকের পর ৩১৪ ট্রিলিয়ন ঘর পর্যন্ত বের করেছেন, কিন্তু শেষ পাওয়া যায়নি।
বান্টির গল্পে ফিরে আসি। সে বুঝতে পারে, ম্যানুয়ালি পাসওয়ার্ড টাইপ করা সম্ভব নয়। তাই সে এলিয়েনদের কম্পিউটারে একটি কমান্ড দেয়—যতক্ষণ না পাইয়ের শেষ মান পাওয়া যায়, ততক্ষণ হিসাব চালিয়ে যেতে। কিন্তু পাই তো অসীম, তাই কম্পিউটার অতিরিক্ত চাপে ক্র্যাশ করে এবং দরজা খুলে যায়। বান্টি বেরিয়ে পড়ে, আর শেখে—মহাবিশ্বের কিছু রহস্য পাইয়ের মতোই অসীম।




