ছোটখাটো স্থানীয় বিবাদের সূত্র ধরে কীভাবে গোটা জাতিকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া যায়, ভৈরবের সাম্প্রতিক তিনটি অপ্রীতিকর ঘটনা তারই যেন জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। গত দেড় মাসের ব্যবধানে এখানে সংঘটিত পৃথক তিনটি সংঘর্ষের নেপথ্যে ছিল যথাক্রমে একটি ফুটবল ম্যাচ, একটি মাইক্রোবাস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং একটি বাজারের নামকরণের বিরোধ। এই আপাতদৃষ্টিতে নগণ্য কারণগুলোর সূত্র ধরে সৃষ্ট সহিংসতা দ্রুতই রেললাইন ও জাতীয় মহাসড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়ে, যার ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন নেটওয়ার্কে তীব্র স্থবিরতা নেমে আসে।

পহেলা ঘটনাটি শুরু হয় গত ৪ জুন রাতে। ভৈরব পৌরসভার পঞ্চবটি ও জগন্নাথপুর এলাকার তরুণদের আয়োজনকৃত একটি ফুটবল খেলা চলাকালে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়। এই বিরোধ দ্রুতই ভৈরব রেলস্টেশনের দুই প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে, যা সহিংসতার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট এবং ঢাকা-নোয়াখালীসহ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে টানা প্রায় ছয় ঘণ্টা রেল চলাচল সম্পূর্ণরূপে স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এসময় স্টেশনের অবকাঠামো ও একটি পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়, এবং পনেরোটির মতো দোকান লুটের শিকার হয় বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। সহিংসতা দমন করতে গিয়ে পুলিশের ছয় সদস্য আহত হন।

মাত্র কয়েক দিন পর, ১০ জুন আরেকটি সংঘর্ষ পৌর এলাকার ভৈরবপুর ও কমলপুরের বাসিন্দাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, যার মূলে ছিল একটি মাইক্রোবাসস্ট্যান্ডের দখল। এই বিরোধ দ্রুতই এলাকা ছাড়িয়ে ঢাকা-সিলেট ও ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক এই দুই ব্যস্ততম সড়কে পৌঁছে যায়। সন্ধ্যার পর শুরু হওয়া এই হামলা চলে গভীর রাত দুইটা পর্যন্ত। ফলে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচন সম্পূর্ণরূপে স্তব্ধ হয়ে থাকে। উভয় মহাসড়কে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হয়ে অসংখ্য মানুষকে চরম ভোগান্তির মধ্যে ফেলে দেয়। এই ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের সাথেও কমপক্ষে ২০ জন আহত হয় এবং একাধিক গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

সবশেষ ২৭ জুলাই তৃতীয় ও সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে। এর সূত্রপাত ভৈরব-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে সড়ক ও জনপদ বিভাগ কর্তৃক স্থাপিত একটি সচেতনতামূলক সাইনবোর্ডকে কেন্দ্র করে, যেখানে 'আকবরনগর বাজার' লেখা ছিল। এই লেখা নিয়ে আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের মানুষের মধ্যে সৃষ্ট ক্ষোভ ভয়ংকর সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে দুজন মানুষের মৃত্যু হয় এবং অন্তত ২৫ জন আহত হন। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে যখন সংঘর্ষে লিপ্ত মানুষজন ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করতে শুরু করে। চল্লিশটির মতো ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার পাশাপাশি একটি ট্রেনের যাত্রাও বাতিল করতে হয়।

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান এই প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনাগুলোর গভীরে বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে মূল কারণগুলো তেমন বড় কিছু ছিল না, কিন্তু পরিণতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। এর প্রভাব কেবল স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছিল। কেন এমন হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতাকে দায়ী করেন।

ভৈরবের রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন, নিজেদের ক্ষমতা জাহির করার প্রবণতা এবং আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতায় কেউই সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা বিবেচনায় আনছিল না। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনা অত্যন্ত জরুরি, এবং এর জন্য দলীয় চিন্তার বাইরে গিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিতভাবে নাগরিক সচেতনতা তৈরির কাজ শুরু করতে হবে। সংঘর্ষের পর পুলিশ মোট পাঁচটি মামলায় ১০৬ জনকে এজাহারভুক্ত আসামি করে এবং অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার ছাড়িয়ে গেছে, তবে স্থানীয়দের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।