আফ্রিকার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক সময় যার নাম ছিল তুঙ্গে, সেই নাইজেরিয়ার পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) এখন ধ্বংসের পথে। জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এক সময়ের এই রাজনৈতিক জায়ান্টটি এখন কার্যত বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।
দেশটির রাজনীতিতে দীর্ঘ দুই দশক ধরে আধিপত্য বিস্তার করে থাকা পিডিপি ধীরে ধীরে তার ভরকেন্দ্র হারিয়ে ফেলেছে। ১৯৯৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত টানা তিন মেয়াদে দেশ শাসন করা দলটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক জনসমর্থন হারিয়েছে। অভ্যন্তরীণ factional দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের সংকট এবং ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ দলটির ভিত নড়িয়ে দিয়েছে।
জানুয়ারির নির্বাচনী ফলাফল ছিল পিডিপির জন্য চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত। ওই নির্বাচনে দলটি প্রত্যাশার চেয়েও খারাপ ফল করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল মূলত দলটির ক্রমাগত পতনের ইঙ্গিত বহন করে। নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর দলটির মধ্যে হতাশা ও নেতৃত্বের শূন্যতা আরও প্রকট হয়েছে।
পিডিপির এই পতনের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। প্রথমত, দলটির অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কখনোই থামেনি। দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বারবার ব্যাহত হয়েছে ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে। দ্বিতীয়ত, দলটি তরুণ প্রজন্মের সাথে সংযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ তরুণ ভোটাররা বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। তৃতীয়ত, পিডিপির নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট নয় বলে সমালোচনা রয়েছে।
এছাড়াও, ক্ষমতাসীন অল প্রগ্রেসিভ কংগ্রেস (এপিসি) দলের উত্থান পিডিপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এপিসি তাদের শাসনামলে কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা জনগণের কিছুটা মনোযোগ কেড়েছে। পিডিপির পুরনো রাজনৈতিক কৌশল আর কার্যকর হচ্ছে না।
নির্বাচনে পরাজয়ের পর পিডিপির অনেক শীর্ষ নেতা দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দিয়েছেন। এই দলত্যাগের ধারা দলটির অস্তিত্বকে আরও সংকটে ফেলেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি দলটি দ্রুত সংস্কার ও পুনর্গঠনের উদ্যোগ না নেয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটি নাইজেরিয়ার মূলধারার রাজনীতি থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকরা আরও মনে করছেন, পিডিপির পতন নাইজেরিয়ার বহুদলীয় রাজনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। দেশটিতে এখন কার্যত একদলীয় আধিপত্যের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তবে পিডিপির কিছু নেতা এখনও আশাবাদী। তারা মনে করছেন, দলটি তার ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জনগণের মনে পিডিপির ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আফ্রিকার এক সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলটি এখন তার টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। আগামী দিনগুলোতে দলটির করণীয় কী হবে, সেদিকেই তাকিয়ে থাকবে নাইজেরিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গন।



