নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোয়ালী গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী ময়না বেগমের সংসারে নেমে এসেছে গভীর শোক। সংসারের অভাব দূর করার স্বপ্নে দুই ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে ছেলেদের বিদেশে পাঠানো হয়েছিল, যা সুদে-আসলে এখন ৮ লাখ টাকা। ঋণ শোধ করার আগেই সৌদি আরবের রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর ছেলে মোহন প্রামাণিক (২২) ও সুমন প্রামাণিক (১৬)।
গত রোববার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার দিকে ওই কারখানায় আগুন লেগে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁয়, যার মধ্যে আত্রাইয়ের গন্ডগোয়ালী গ্রামেরই চারজন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পরিবারগুলোতে শোকের পাশাপাশি এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদেশযাত্রার জন্য নেওয়া ঋণের বোঝা। মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের মধ্যে অনেকেই ভাবছেন কীভাবে সেই ঋণ শোধ করবেন এবং কীভাবে চলবে সংসার।
ময়না বেগমের স্বামী অসুস্থ, ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। ছোট ছেলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বড় ছেলে মোহন ও মেজ ছেলে সুমনই ছিলেন পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। নির্মাণাধীন বাড়ির ভিটায় দাঁড়িয়ে দুই ছেলের স্মৃতিচারণা করে ময়না বেগম জানান, সাত বছর আগে বড় ছেলে মোহন জমি বন্ধক রেখে ও সমিতি থেকে ৪ লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি গিয়েছিল। সুদে-আসলে সেই টাকা এখন ৮ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। দুই বছর আগে মেজ ছেলে সুমনও সৌদি যায়। ময়না বেগমের ভাষ্য, 'ওরা হামাক স্বপ্ন দেখাছিল ওখানে কাজ করে ঋণের টাকা শোধ করবে। পাকা বাড়ি করে দিবে। ওদের দুজনের পাঠানো টাকা দিয়েই চার দিন আগে বাড়ির কাজ শুরু করেছি। বড় ছেলের স্বপ্ন ছিল, বাড়ি করা শেষ হলে দেশে এসে বিয়ে করবে। এখন বাড়ি দিয়ে কী হবে, যেখানে আমার দুই ছেলেই নেই।'
একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন আত্রাইয়ের সাইদুর প্রামাণিক ও আনোয়ারা বেগম দম্পতি। তাদের ছেলে রুবেল প্রামাণিকও এই অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন। দীর্ঘদিন সন্তান না হওয়ায় অনেক দোয়া-দরুদের পর রুবেলের জন্ম হয়েছিল বলে জানান আনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, 'অসুখ-বিসুখের কারণে ছাওয়াল হচ্ছিল না। একটা ছাওয়াল আশা করেছিলাম। ছাওয়াল হলে ভাত-পানি দেবে, বুড়া বয়সে আমাদের দেখবে। অনেক দোয়া-দরুদের পর রুবেল হলো। সেই ছাওয়ালটাই আমাদের এভাবে চলে গেল। এখন আমাদের কে দেখবে? ১৬ দিন হলো মেয়ে বাচ্চা হয়েছে। সেই ছাওয়ালটাও বাপ হারালো। আমাদের এখন কী হবে?' রুবেলের বাবা সাইদুর প্রামাণিক আগে মাছ ধরতেন, কিন্তু অসুস্থতার কারণে এখন আর সেই কাজ করতে পারেন না। সংসারের অভাব ঘোচাতে ধারদেনা করে তিন মাস আগে রুবেলকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছিল।
নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ রেজিস্ট্রিপাড়ার মিম বেগমের স্বামী শাহীনুর রহমানও এই অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন। সংসারের অভাব ঘোচাতে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ করে পাঁচ মাস আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শাহীনুর। নওগাঁ সদর উপজেলার পার-বোয়ালিয়া এলাকায় বসতভিটার জমি বন্ধক রেখে সমিতি থেকে এই টাকা নেওয়া হয়েছিল। মিম বেগমের আশঙ্কা, ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সমিতির লোকজন বসতভিটার জমি নিয়ে নিতে পারে। দুই সন্তান ও অসুস্থ শাশুড়িকে নিয়ে সংসার চালানোই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, 'সুখের আশায় আমার স্বামী বিদেশে গেল। কিন্তু বিদেশে গিয়েই তার জানটা চলে গেল। দেশে থাকলে রিকশা-ভ্যান চালিয়ে হলেও সংসার চলত। আমার দুই সন্তান তাদের বাবাকে পেত। এখন তাদের আমি কীভাবে মানুষ করব?'




