আজ বুধবার পশ্চিম ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের আকাশে দেখা যাচ্ছে বছরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মহাজাগতিক ঘটনা—পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। ১৯৯৯ সালের পর এই প্রথম উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের মানুষ এত বড় পরিসরে এমন বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হতে চলেছেন। চাঁদের প্রচ্ছায়া এবার উত্তর সাইবেরিয়া, আর্কটিক মহাসাগর এবং পূর্ব গ্রিনল্যান্ড অতিক্রম করে পশ্চিম আইসল্যান্ড ও উত্তর স্পেনের ওপর দিয়ে যাবে। পরে উত্তর-পূর্ব পর্তুগালের কিছু অংশ স্পর্শ করে স্পেনের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল এবং বালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জে সূর্যাস্তের মাধ্যমে শেষ হবে এই ঘটনা।

সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ যখন সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে অবস্থান করে, তখন চাঁদের ছায়ার কেন্দ্রভাগের ঘন অন্ধকার অংশকে প্রচ্ছায়া বলা হয়। পৃথিবীর যে অঞ্চলের ওপর দিয়ে এই প্রচ্ছায়া যায়, সেখানকার মানুষই কেবল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে পান। আইসল্যান্ডের পশ্চিমে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর এই গ্রহণের স্থায়িত্ব সবচেয়ে বেশি থাকবে। গ্রিনিচ মান সময় বিকেল ৩টা ৪৮ মিনিটে (স্থানীয় সময় ৫টা ৪৮ মিনিট) আইসল্যান্ডের রাজধানী রিকজাভিক থেকে পূর্ণগ্রাস গ্রহণটি স্পষ্ট দেখা যাবে। অন্যদিকে, স্পেনের উত্তরাঞ্চলের শহর ‘আ করুনিয়া’ ও ‘বিলবাও’-এর কিছু এলাকায় সূর্যাস্তের ঠিক আগ মুহূর্তে পূর্ণগ্রাস গ্রহণ শুরু হবে। উত্তর-পশ্চিম স্পেনে গ্রিনিচ মান সময় ৬টা ২৮ মিনিটে (স্থানীয় সময় রাত ৮টা ২৮ মিনিট) এই দৃশ্য দেখা যাওয়ার কথা। তবে মাদ্রিদ ও বার্সেলোনাসহ ইউরোপের বেশিরভাগ অঞ্চলের মানুষ আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পাবেন।

চাঁদ যখন পৃথিবীর কাছাকাছি থাকে, তখন তাকে আকাশে বড় দেখায় এবং এটি সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দিতে সক্ষম হয়। এতে দিনের আলো মুহূর্তেই অন্ধকারে রূপ নেয়, তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যায় এবং আকাশে উজ্জ্বল তারাগুলোও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। চাঁদ যখন সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়, তখন তাকে পূর্ণগ্রাস গ্রহণ বলে। আর যখন সূর্যের চারপাশে একটি উজ্জ্বল আলোর বলয় দেখা যায়, তখন তাকে বলয়গ্রাস বা ‘অ্যানুলার’ সূর্যগ্রহণ বলে। পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বের ওপরই মূলত এই পার্থক্য নির্ভর করে। চাঁদের কক্ষপথ বৃত্তাকার না হয়ে উপবৃত্তাকার হওয়ায় আকাশে এর আকার কখনো বড়, আবার কখনো ছোট দেখায়। পূর্ণগ্রাসের কয়েক মিনিটে খালি চোখেই সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল বা ‘করোনা’ দেখার সুযোগ পান পর্যবেক্ষকেরা। এই সংকীর্ণ পথ বা ‘পাথ অব টোটিলিটি’র বাইরে উত্তর গোলার্ধের বিশাল এলাকা জুড়ে আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালিসহ ইউরোপের বেশিরভাগ দেশের মানুষ সূর্যাস্তের আগে এই দৃশ্য উপভোগ করবেন। উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকাতেও গভীর আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। কানাডার উত্তর ও পূর্ব অংশ, আলাস্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকেও আংশিক গ্রহণ দৃশ্যমান হবে। তবে চোখের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ সৌর চশমা বা সোলার গ্লাস পরা আবশ্যক, কারণ সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বিশ্বজুড়ে পরবর্তী পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ২০২৮ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে, ২০৩০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় এবং ২০৩৫ সালে জাপানে দেখা যাবে। যুক্তরাজ্যে পরবর্তী পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের জন্য ২০৯০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ফ্রান্সে ২০৮১ সালে এবং জার্মানিতে আগামী শতাব্দীর আগে কোনো পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না। উত্তর আমেরিকায় আবার ২০৪৪ সালে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ফিরে আসবে, যখন চাঁদের ছায়া পশ্চিম কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম অংশের ওপর দিয়ে যাবে। এর পরের বছরই ২০৪৫ সালে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের এক উপকূল থেকে অন্য উপকূল পর্যন্ত আরেকটি সূর্যগ্রহণ দৃশ্যমান হবে। তবে তখন পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকায় সূর্যাস্তের সময় গ্রহণ চলতে থাকবে।

চাঁদ যখন পৃথিবী থেকে তুলনামূলক দূরে থাকে, তখন সেটি সূর্যের চেয়ে আকারে ছোট দেখায়। এমন অবস্থায় চাঁদ সূর্যের মাঝখান দিয়ে গেলেও সূর্যকে পুরোপুরি আড়াল করতে পারে না। ফলে সূর্যের চারপাশে একটি উজ্জ্বল আলোর রিং বা আংটি দৃশ্যমান হয়, যাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় ‘রিং অব ফায়ার’ বা অগ্নিকুণ্ডলী বলা হয়। এ সময় আকাশ কিছুটা মলিন হয়ে উঠলেও পুরোপুরি অন্ধকার হয় না। ২০২৬ সালের এই ঘটনাটি স্পেনের আকাশে পরপর তিনটি সূর্যগ্রহণের প্রথম ধাপ। ২০২৭ সালের ২ আগস্ট সেখানে আবার পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে, যার পথ দক্ষিণ স্পেন পেরিয়ে মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিসর, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের ওপর দিয়ে এগিয়ে যাবে। এরপর ২০২৮ সালের ২৬ জানুয়ারি স্পেনের আকাশে দেখা যাবে একটি বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ। স্পেনে ২০২৮ সালের এই ঘটনার পর ইউরোপে আর কোনো বলয়গ্রাস গ্রহণ বেশ কয়েক বছর দেখা যাবে না। পরের বলয়গ্রাস গ্রহণগুলো ২০৩০-এর দশকে পর্যায়ক্রমে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশের ওপর দিয়ে যাবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, এনডিটিভির খবর অনুযায়ী ভারতের ক্ষেত্রে এই মহাজাগতিক ঘটনা ঘটবে আজ রাতে, ফলে ভারতের আকাশে কোনো সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না। ভারতীয় প্রমাণ সময় অনুযায়ী ১২ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ১৩ আগস্টের প্রথম প্রহরের মধ্যে এটি ঘটবে। ভারতীয় সময় রাত আনুমানিক ৯টা ৪ মিনিটে গ্রহণ শুরু হয়ে রাত ১১টা ১৬ মিনিটে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এই সময় বিবেচনায় বাংলাদেশের কোথাও সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না, কারণ তখন সূর্য দিগন্তরেখার নিচে থাকবে। তবে আকাশপ্রেমীরা নাসা ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ইএসএসহ প্রধান মহাকাশ সংস্থাগুলোর সরাসরি অনলাইন সম্প্রচার দেখতে পারবেন।