সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া বাংলা ওয়েব সিরিজ ‘হেডলাইন’ দর্শক ও সমালোচকদের নজর কেড়েছে। ১৯৮ মিনিট দীর্ঘ এই আট পর্বের সিরিজের কাহিনী শুরু হয় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার পর রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা দিয়ে। ডিস্ট্রিবিউশনের গাড়ি ও ছাপাখানা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় পত্রিকা ও ছাপার উপকরণ। প্রতিবেদনে অর্থ পাচারের সাথে জড়িত এক সন্ত্রাসীর ঘনিষ্ঠ সহযোগীর দেশে ফেরা এবং ক্ষমতাশালী চক্রের তথ্য ছিল, যা নিউজ কিলিংয়ের এক ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে চিত্রিত হয়েছে।

সিরিজটি নির্মাণ করেছেন আয়মান আসিব স্বাধীন, ‘তাকদীর’ ও ‘কারাগার’ খ্যাত সৈয়দ আহমেদ শাওকী এবং প্রথমবার ওয়েব সিরিজ পরিচালনায় আসা সালেহ সোবহান অনীম। এই টিমের পূর্ববর্তী কাজ দর্শকদের মধ্যে আস্থা তৈরি করায় ‘হেডলাইন’ নিয়ে প্রত্যাশা ছিল অনেক। পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, নির্মাতারা সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছেন।

গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন পোড় খাওয়া সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার জহির আহমেদ (জিয়াউল ফারুক অপূর্ব) এবং অর্থবিষয়ক বিটের তরুণ প্রতিবেদক সামিউল (ইয়াশ রোহান)। তাদের সম্পর্কের মানবিক রসায়ন সিরিজটিকে শুধু থ্রিলার হয়ে থাকতে দেয়নি; গম্ভীর গল্পের মাঝে হাস্যরসাত্মক মুহূর্ত প্রয়োজনীয় স্বস্তি এনে দিয়েছে।

অভিনয় প্রসঙ্গে, জিয়াউল ফারুক অপূর্বকে সংযত চরিত্রে দেখা গেছে, যেখানে চোখের ভাষা ও নীরবতা চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে তবে কখনো কখনো তার রোমান্টিক নায়কের ইমেজ সামনে চলে এসেছে বলে মন্তব্য রয়েছে। ইয়াশ রোহানের অভিনয় স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত; তাকে সত্যিকারের তরুণ সাংবাদিকের মতো মনে হয়েছে। আফসান আরা বিন্দু আইরিন চরিত্রে আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি দেখিয়েছেন, অন্যদিকে সারিকা সাবরিন ও ফারহানা হামিদ সংযত অভিনয় করেছেন। তমা মির্জা অল্প সময়ের উপস্থিতিতেই নজর কেড়েছেন। শ্যামল মাওলা চরিত্রটির রহস্যময়তা ধরে রাখলেও তার চরিত্র আরও বিস্তৃত হলে ভালো হতো বলে মত দিয়েছেন পর্যালোচকরা। চঞ্চল চৌধুরীর উপস্থিতি চমক সৃষ্টি করলেও তার চরিত্রটি গল্পের বুননের সাথে পুরোপুরি মিশে যেতে পারেনি। দুই শিশুশিল্পী রাই রাজন্যা ও অর্নীল বিরলের অভিনয়ও প্রশংসিত হয়েছে।

সিরিজটির সংলাপ বিশেষভাবে শক্তিশালী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘একবার সাহস করে ঝড়ের মুখোমুখি হতে পারলে আকাশ ভাঙা তুফানও হার মানতে বাধ্য হয়’—এ ধরনের সংলাপ দর্শকদের মধ্যে দাগ কেটেছে। আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গে, ‘হেডলাইন’-কে স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘দ্য পোস্ট’ ও টম ম্যাকার্থির ‘স্পটলাইট’–এর সাথে তুলনা করা হয়েছে; প্রথমটির সাথে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং দ্বিতীয়টির সাথে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চেতনার মিল রয়েছে।

সমাপ্তি নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর সমাজে তার প্রতিক্রিয়া ও ক্ষমতাশালী চক্রের পরিণতি সম্পর্কে দর্শক জানতে পারেন না। তবে নির্মাতারা ইচ্ছা করেই কিছু প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। শেষ দৃশ্য এই ইঙ্গিতই দেয় যে গল্প থামলেও জহির ও সামিউলের লড়াই অব্যাহত। সামগ্রিকভাবে, ‘হেডলাইন’ কেবল বিনোদন নয়, এটি সাংবাদিকতার নৈতিকতা, ক্ষমতার অদৃশ্য বলয় ও সত্য প্রকাশের দায় নিয়ে তৈরি একটি পরিপক্ব কাজ বলে অভিহিত হয়েছে। বাংলাদেশে এ ধরনের নির্মাণ বিরল, তাই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।