পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই ডানহাতি, অর্থাৎ দশজনে নয়জনই তাদের অধিকাংশ কাজ ডান হাত দিয়ে সম্পন্ন করে। এই সুস্পষ্ট বৈষম্যের পেছনের কারণগুলো কী, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে। আমাদের চারপাশের জগৎটিও যেন অজ্ঞাতেই ডানহাতিদের কথা ভেবেই নির্মিত হয়েছে। একটি সাধারণ কাঁচি থেকে শুরু করে স্পাইরাল নোটবুকের পেঁচানো তার, টিনের কৌটা খোলার যন্ত্র, ব্যাংকের শিকল-বাঁধা কলম বা ক্লাসরুমের ডান পাশে হাতল-লাগানো বেঞ্চ— এসব ব্যবহার করতে গিয়ে বাঁহাতিদের বেগ পেতে হয়।

এই পার্থক্যের শুরু কখন হয় তা জানতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা মাতৃগর্ভের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানের বরাতে দেখা যায়, মাত্র দশ সপ্তাহ বয়সেই একটি ভ্রূণ বাঁ হাতের চেয়ে ডান হাত বেশি সঞ্চালন করে। এমনকি পনেরো সপ্তাহে পৌঁছে অনেকেই বাঁ আঙুল ছেড়ে ডান হাতের বুড়ো আঙুল চোষা শুরু করে। সুতরাং, জন্মের অনেক আগেই ভ্রূণাবস্থায় নির্ধারিত হয়ে যায় ব্যক্তিটি ডানহাতি হবে নাকি বাঁচাতি।

মস্তিষ্কের বিকাশ এবং এক ডজনেরও বেশি জিনের সম্মিলিত প্রভাব আমাদের মস্তিষ্কের কাঠামো এমনভাবে গড়ে তোলে যাতে ডান হাতের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়। তবে প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ছাঁচে ফেলা নয়। মস্তিষ্কের গঠনের সময় অতি সামান্য বিচ্যুতির কারণে অনেকেই বাঁচাতি হিসেবে জন্মায়। আবার শুধু জিনগত ব্যাখ্যাই শেষ কথা নয়, এর সাথে মিশে আছে আমাদের পূর্বপুরুষদের বেঁচে থাকার ইতিহাস।

প্রাচীন যুগের কথা বিবেচনা করা যাক। তৎকালীন মানুষ দল বেঁধে থাকতো এবং একে অপরের অনুকরণে পাথরের হাতিয়ার বানানো বা বর্শা ছোড়ার কৌশল শিখত। দলের সবাই একই হাত ব্যবহার করলে শেখার প্রক্রিয়াটি সহজতর হয়। ২০১১ সালের এক পরীক্ষায় পাঁচ লাখ বছরেরও পুরনো পাথরের যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে তাতে ডানহাতি ব্যবহারের সুস্পষ্ট নিদর্শন মিলেছে। আরেকটি চিত্তাকর্ষক তত্ত্ব হল যুদ্ধের সুবিধা। হৃদপিণ্ড বুকের বাঁ পাশে থাকায়, ডানহাতি যোদ্ধার পক্ষে প্রতিপক্ষের বাঁ দিকে আক্রমণ করা তুলনামূলক সহজ। হাজার হাজার বছরের এ ছোট্ট সুবিধা হয়তো ধীরে ধীরে মানবজাতির এক বিশাল অংশকে ডানহাতিতে পরিণত করেছে।

তাহলে বাঁচাতিরা সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি কেন? এর জবাব লুকিয়ে আছে খেলার মাঠে। বাঁচাতিরা হঠাৎ এক অনাকাঙ্ক্ষিত কৌশলের বিস্ময় তৈরি করতে পারে। সারা জীবন ডানহাতির বিপক্ষে লড়ে অভ্যস্ত কেউ যখন বাঁচাতি প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হয়, তখন তার গতিবিধি বুজতে বেশ বিড়ম্বনায় পড়ে। খেলার ইতিহাসে এই সুবিধার অসংখ্য নজির রয়েছে। বেসবলের বেব রুথ, টেনিসের রাফায়েল নাদাল, বাস্কেটবলের বিল রাসেল এবং ক্রিকেটে স্যার গ্যারিফিল্ড সোবার্স, ব্রায়ান লারা, কুমার সঙ্গকারা, সৌরভ গাঙ্গুলী, সাকিব আল হাসান, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও ডেভিড ওয়ার্নার—বাঁচাতি খেলোয়াড়দের সাফল্য একথা মনে করিয়ে দেয়।

মজার বিষয় হল, এই বৈশিষ্ট্য কেবল আমাদের মতো আধুনিক হোমো স্যাপিয়েন্সদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নিয়ানডারথালদেরও ছিল ডান হাতের প্রতি একই রকম পক্ষপাত। প্রত্নতাত্তিকেরা তাদের হাড়গোড় পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছেন যে, ডান হাতের হাঁড় বাম হাতের তুলনায় অনেক বেশি মজবুত ও মোটা ছিল, যা ডান হাতের অধিক ব্যবহারকেই নির্দেশ করে। সবশেষে বলঅ যায়, জিন, মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ সংগঠন এবং বিবর্তনের সুদীর্ঘ চাপ—এই সবকিছুর এক অভিনব মিশেলেই মানুষ মূলত ডানহাতি প্রাণীতে পরিণত হয়েছে।