পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই সুখের সন্ধানে রয়েছে। তবে সুখ আসলে কী এবং কীভাবে তা অর্জন করা যায়, তা নিয়ে আমাদের ধারণা অনেক সময় ভুল। মন খারাপের সময় আমরা প্রায়ই ব্যয়বহুল কেনাকাটা বা সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলি, কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পদ্ধতিগুলো দীর্ঘমেয়াদী সুখ বয়ে আনে না। বরং জোর করে সুখী হওয়ার চেষ্টা করলে তা উল্টো ফল দিতে পারে।
২০১৪ সালে শিকাগো এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলাস এপলি ও জুলিয়ানা শ্রোয়েডার একটি পরীক্ষা চালান। তারা বাস ও ট্রেনযাত্রীদের তিনটি দলে ভাগ করেন। প্রথম দলকে অচেনা কারো সাথে কথা বলতে বলা হয়, দ্বিতীয় দলকে চুপচাপ থাকতে, আর তৃতীয় দলকে স্বাভাবিক আচরণ করতে। ফলাফলে দেখা যায়, যারা অচেনা মানুষের সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছিলেন, তাদের যাত্রা সবচেয়ে আনন্দদায়ক ছিল। তারা আগে ভেবেছিলেন এতে বিরক্তি লাগবে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ২০২০ সালের আরেকটি গবেষণায় উঠে আসে, অচেনাদের সাথে কথা বলতে আমাদের ভয় মূলত অমূলক। তাই মন ভালো করতে চাইলে লিফট বা বাসে অচেনা কারো সাথে দু'টি কথা বলার চেষ্টা করুন।
টাকা এবং সুখের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, বেশি টাকা থাকলে তারা সুখী হবেন। কিন্তু ২০১৯ সালে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, যারা সময়কে টাকার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন, তারা এক বছর পর অপেক্ষাকৃত বেশি সুখী ছিলেন। অবশ্য টাকা দিয়েও সুখ কেনা যায়, তবে তা সঠিক জায়গায় ব্যয় করতে হবে। ২০১৮ সালে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল ও ইউসিএলএর গবেষকরা বলেন, জিনিসপত্র কেনার চেয়ে তিনটি জিনিসে টাকা খরচ করলে দীর্ঘস্থায়ী সুখ পাওয়া যায়—অন্যের উপকার, নতুন অভিজ্ঞতা এবং সময় কেনা। যেমন নিজের কাজ অন্যকে দিয়ে করিয়ে নিয়ে অবসর সময় পাওয়া। তবে এটি কেবলমাত্র তাদের জন্য প্রযোজ্য যাদের দৈনন্দিন খরচের অতিরিক্ত অর্থ রয়েছে।
জোর করে সুখী হওয়ার চেষ্টা করলে বিপরীত ফল হতে পারে। ২০১১ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, যারা সুখী হওয়াকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য করে নেন, তারা ছোটখাটো বিষয়েও সহজেই হতাশ হন। একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের একটি আনন্দদায়ক ভিডিও দেখানোর আগে সুখের গুরুত্ব নিয়ে পড়ানো হয়েছিল। যাদের এভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল, তারা ভিডিও দেখার পর কম আনন্দ পেয়েছেন, কারণ তাদের প্রত্যাশা ছিল ভিডিওটি তাদের অত্যন্ত সুখী করবে।
বিখ্যাত দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছিলেন, নিজের সুখের ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ না দেওয়াই ভালো। ২০১৭ সালে টরন্টো ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একমত পোষণ করেন। তাদের মতে, নিজের আবেগকে জোর করে নিয়ন্ত্রণ না করে মন খারাপ হলে সেটা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া উচিত। সব সময় সুখী হতে হবে, এই চাপ মাথা থেকে সরিয়ে ফেললেই প্রকৃত শান্তি পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত, সুখ কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সমষ্টি। তাই সুখের পেছনে হন্যে হয়ে না ছুটে বর্তমান মুহূর্তকে উপভোগ করাই আসল সুখের চাবিকাঠি।




