গত রাতে ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষ হয়েছে। মাঠের ট্রফি জয়ের উল্লাস ধীরে ধীরে স্তিমিত হলেও পর্দার আড়ালে এক ভিন্ন অর্থনীতি সক্রিয় ছিল। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই মেগা আসর বিশ্বজুড়ে লাখো তরুণের জন্য খণ্ডকালীন কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বিশ্বকাপের মাসে সাময়িক শ্রমবাজার প্রায় ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এই কর্মযজ্ঞের মূল চালিকাশক্তি তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা পড়াশোনার পাশাপাশি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের বিপণন ও লজিস্টিকসের মতো কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করছেন, যা তাদের আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য প্রস্তুত করছে।
টুর্নামেন্ট চলাকালে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রথাগত কাঠামো পরিবর্তন করে এক বিশাল অনানুষ্ঠানিক কর্মী বাহিনী মাঠে নামিয়েছিল। স্পোর্টস বিজনেস জার্নালের একটি বিশেষ সংখ্যায় এই মেগা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের অভ্যন্তরীণ চিত্র ফুটে উঠেছে। স্টেডিয়ামের টিকিট পরীক্ষা, দর্শকদের আসন নির্ধারণ, নিরাপত্তাবেষ্টনী পরিচালনা, বিদেশি অতিথিদের গাইড করা এবং ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই তরুণদের সুনিপুণ দক্ষতায় পরিচালিত হয়েছে। আতিথেয়তা খাতেও বিপুল চাহিদা ছিল। তারকা হোটেল থেকে শুরু করে পাড়ার ক্যাফে এবং অফিশিয়াল ফ্যান জোন—সবখানেই খণ্ডকালীন কর্মীর প্রয়োজন দেখা গেছে।
ডিজিটাল দুনিয়া এই সমীকরণকে আরও উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম লাইভ টেক্সট কমেন্টেটর ও ভিডিও এডিটর নিয়োগ দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার গ্রাফিকস ডিজাইন এবং ফ্যান কমিউনিটি এনগেজমেন্টের মতো সূক্ষ্ম কাজেও তরুণদের কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। স্পোর্টস ব্র্যান্ডের আউটলেটগুলোতে জার্সি ও স্যুভেনির বিক্রির ধুম সামলাতেও তরুণরাই মূল ভূমিকা রেখেছেন। বিবিসি স্পোর্টসের ফুটবল অর্থনীতি বিষয়ক বিশেষ তথ্যানুসন্ধান অনুযায়ী, গত কয়েকটি টুর্নামেন্ট মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি সাময়িক কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল, যার প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল তরুণদের দখলে। একজন শিক্ষার্থী মাত্র এক মাসের চুক্তিভিত্তিক কাজ থেকে গড়ে দেড় থেকে তিন হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে। ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েশনে যুক্ত তরুণদের আয়ের হার বেশি এবং কাজের স্থায়িত্বের সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ।
এই অর্থ তরুণদের শুধু আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে না, বরং বহুজাতিক করপোরেট সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচয় করিয়ে দেয়। করপোরেট সময়ানুবর্তিতা, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ও যোগাযোগের বাস্তব শিক্ষা তারা এই এক মাসে পেয়ে যান, যা পরবর্তী সময়ে স্থায়ী চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় প্লাস পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিশ্বকাপের ঢেউ লক্ষণীয়। মাঠে না খেললেও বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের অফিশিয়াল জার্সি তৈরিতে দেশের কারখানাগুলোতে অনেক তরুণের সাময়িক কর্মসংস্থান হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে জার্সি ও পতাকার কোটি টাকার বাণিজ্য সামলাতেও হাজারো শিক্ষার্থী পার্টটাইম সেলস ও লজিস্টিকসে যুক্ত ছিলেন। দেশীয় স্পোর্টস অ্যাপ ও নিউজ পোর্টালগুলো ম্যাচ বিশ্লেষণ, লাইভ ব্লগিং ও সোশ্যাল মিডিয়া মডারেশনের জন্য প্রচুর ফ্রিল্যান্সার ও সাব-এডিটর নিয়োগ দিয়েছে। শহরের ফ্যান জোনগুলো সফল করতে শত শত তরুণ ইভেন্ট ক্রু ও টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছেন। এই অভিজ্ঞতা তাদের সিভিতে যোগ হওয়ায় ভবিষ্যতে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবেন। বিশ্বকাপের এই অর্থনৈতিক রূপান্তরকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার যুবসমাজকে দক্ষ ও আন্তর্জাতিক গিগ ইকোনমির উপযোগী করে গড়ে তুলতে পারে। মাঠের ফাইনাল শেষ হলেও তরুণদের ক্যারিয়ারের নতুন পিচ তৈরি হয়েছে, যার রেশ দীর্ঘদিন ধরে থাকবে।




