ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজ সংস্থার কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের অঙ্গীকার সত্ত্বেও ২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালীন ব্যাপক মাত্রায় বিমান ভ্রমণ করেছেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তিন দেশে অনুষ্ঠিত এই আসর চলাকালে তিনি ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় আকাশে কাটিয়েছেন এবং মোট ভ্রমণ দূরত্ব দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৯,২৮১ মাইল (৯৫,৪০৩ কিলোমিটার), যা বিশ্বকে আড়াই বার প্রদক্ষিণ করার সমান।
ইনফান্তিনোর এই বিরাট উড়াল সম্ভব হয়েছে কাতার সরকারের একটি Gulfstream G650 জেট ব্যবহারের মাধ্যমে। বিমানটি কাতার এয়ারওয়েজের বেসরকারি চার্টার বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়, যা বিশ্বকাপের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। ট্র্যাকিং সাইট ফ্লাইটঅ্যাওয়ারের তথ্যমতে, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ৯ জুন লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে মেক্সিকো সিটিতে প্রথম ফ্লাইটের পর থেকে বিমানটি গড়ে প্রতিদিন একাধিকবার উড়েছে এবং কোনও কোনও দিন তিনবারের বেশি ফ্লাইট করেছে।
এপির বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে যে, ইনফান্তিনো মোট ৪৪টি ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন, যা ৩৯ দিনের টুর্নামেন্টের ৩৪টি ম্যাচ ডে-র মধ্যে ৩১ দিনই তিনি স্টেডিয়ামে ছিলেন। তিনি সব মিলিয়ে ১৬টি ভেন্যুতেই অন্তত একটি করে ম্যাচ দেখেছেন। মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে তিনি পাঁচটি ম্যাচে গেছেন, যা অন্যান্য ভেন্যুর চেয়ে বেশি। পাশাপাশি টুর্নামেন্ট চলাকালে তিনি নিউ ইয়র্কে ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস-এর সাক্ষাৎকার দিতে এবং মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত ফিফা শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে গেছেন। এ ছাড়া কাতারের সাবেক আমিরের জানাজায় যোগ দিতে তাকে দোহা যেতে হয়েছিল এবং সেখান থেকে ফিরে এসে সেমিফাইনালে উপস্থিত হয়েছিলেন।
ভ্রমণসূচির অন্যান্য পরিসংখ্যান উল্লেখযোগ্য। ফ্লাইটের সময় হিসাব করে দেখা গেছে, টুর্নামেন্ট চলাকালে মোট ১১৫ ঘণ্টা উড়াল দিয়েছেন তিনি, যার মধ্যে কাতার যাতায়াতের ২৯ ঘণ্টা অন্তর্ভুক্ত নয়। এই সময়কাল মোটামুটি পাঁচদিনের সমান এবং বাণিজ্যিক উড়োজাহাজে নিউ ইয়র্ক থেকে লস অ্যাঞ্জেলস পর্যন্ত ২০ বার যাওয়ার সমান। দীর্ঘতম ফ্লাইটটি ছিল মিয়ামি থেকে সিয়াটেল, ৫ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট, যা তিনটি পূর্ণ বিশ্বকাপ ম্যাচের সমান সময়। অন্যদিকে সবচেয়ে ছোট ফ্লাইটটি ছিল সিয়াটেল থেকে ভ্যাঙ্কুভার, মাত্র ২৮ মিনিট। একদিনের সবচেয়ে বড় ভ্রমণ হয়েছিল ২৬ জুন, যেদিন তিনি মিয়ামি থেকে ডালাস, ডালাস থেকে সিয়াটেল এবং সিয়াটেল থেকে রাতে মিয়ামি ফিরে আসেন, মোট ৫,৭৭২ মাইল অতিক্রম করে।
প্রায় সব ভেন্যুতে প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করলেও, কখনো কখনো ছোট বিমানবন্দরও ব্যবহার করেছেন তিনি। এ ছাড়া উত্তর আমেরিকার অভ্যন্তরে মোট ২৩টি আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করেছে তার ব্যবহৃত জেটটি সেমিফাইনাল পর্যন্ত।
ফিফা ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বকাপ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে কার্বন নিঃসরণ অর্ধেক কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে নিট-শূন্য নিঃসরণে পৌঁছানোর অঙ্গীকার করেছে। সংস্থাটির টেকসই ও মানবাধিকার কৌশলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে জলবায়ু গবেষক এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে, তিন দেশে বিস্তৃত এই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি কার্বন-নিবিড় আসর হতে পারে, কারণ দল, ভক্ত এবং কর্মকর্তাদের ব্যাপক বিমান ভ্রমণের প্রয়োজন পড়ে। ইনফান্তিনোর এই ব্যক্তিগত উড়াল প্রতিশ্রুতির বিপরীতে গিয়ে অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছে।
ফিফার পক্ষ থেকে অবশ্য ইনফান্তিনোর ভ্রমণসূচি নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। এপির কাছে পাঠানো ইমেলের জবাবেও সংস্থাটি নীরব ছিল।




