কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা অনেকের কাছেই এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে গুগলে তিন দশক ধরে এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা জেফ ডিনের মতে, Gen-Z-দের উচিত সবকিছু আয়ত্ত করার চেষ্টা না করা। তাঁর পরামর্শ হলো—বিস্তৃত পরিসরে পড়াশোনা করা এবং অন্যদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সংযোগগুলো খুঁজে বের করা।

গুগল ছাড়ার পর প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্যে ডিন গতকাল এশিয়ান আমেরিকান স্কলার ফোরামের ২০২৬ ফ্রন্টিয়ার অ্যান্ড পাইওনিয়ার সিম্পোজিয়ামে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “আমি প্রায়ই বলি, একটি পেপার বিস্তারিত পড়ার চেয়ে ১০টি পেপার স্কিম করা ভালো, কারণ এতে আপনার সম্ভাবনার জগতে ১০টি নতুন বিন্দু যুক্ত হয়। এমনকি ১০০টি অ্যাবস্ট্রাক্ট স্কিম করাও ভালো, কারণ আপনি যা চান তা হলো গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা, যা এখনও কেউ করেনি।”

তরুণদের জন্য তাঁর এই পরামর্শ সময়ের সদ্ব্যবহার ও বৃহত্তর পরিসরে চিন্তা করার কৌশল শেখার অংশ। এই পদ্ধতিতে আগে অসম্ভব বলে মনে হওয়া সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যেতে পারে এবং একটি যুক্তিযুক্ত সময়সীমা নির্ধারণেও সহায়তা করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যে সমস্যা সমাধানে ২০ বছর লাগতে পারে তা সম্ভবত খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষী, যদি না তার সমাধানের স্পষ্ট কৌশল থাকে। অন্যদিকে, দুই বছরে সমাধানযোগ্য সমস্যা হয়তো বড় কোনো অগ্রগতি আনতে খুবই সহজ। ডিন বলেন, “দীর্ঘমেয়াদে কাজ করার জন্য একটি সমস্যার আদর্শ রূপ হলো প্রায় পাঁচ বছরের মতো। অনেক কিছু চেষ্টা করুন যা কাজ নাও করতে পারে, তবে কিছু হয়তো সফল হবে।”

ডিন এই মাসের শুরুতেই গুগল থেকে পদত্যাগ করেছেন। প্রতিষ্ঠানটিতে ২৭ বছর কাজ করার সময় তিনি ২০১৮ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত গুগল এআই-এর প্রধান এবং ২০২৩ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত গুগলের প্রধান বিজ্ঞানী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ৫৮ বছর বয়সী ডিন ডিসকভারি লুপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, যা বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলগত আবিষ্কার ত্বরান্বিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে।

প্রযুক্তির কারণে ব্যাপক বেকারত্ব ও বৈষম্য বাড়তে পারে—এমন ভবিষ্যদ্বাণী সত্ত্বেও ডিন এআইয়ের জীবন-উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। তাঁর মতে, “এই মডেলগুলোর বেশিরভাগ ব্যবহার বিশ্বের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় এআই-এর অগ্রগতি মানুষকে নিজেরাই সমস্যা সমাধানে সক্ষম করবে, যা তাদের আরও কিছু করতে দেবে। এটি সত্যিই উত্তেজনাপূর্ণ।” তিনি স্বীকার করেন, এমনকি তাঁর কাছেও কোনো ‘জাদুকরী সমাধান’ নেই এবং প্রায়ই ব্যর্থতার সম্মুখীন হন। তবে তাঁর আশাবাদের একটি বড় কারণ হলো এআই মানুষের হাতে এমন দক্ষতা পৌঁছে দিতে পারে, যা একসময় বছরের পর বছরের বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হতো। ১৯৯৬ সালে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে পিএইচডি করা ডিন বলেন, “বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের বিভিন্ন ক্ষেত্র ভালোভাবে বোঝে এমন মডেল তৈরি করে আপনি বিভিন্ন ডোমেইনে পিএইচডি-স্তরের দক্ষতা একটি মডেলে পেতে পারেন।”

ডিনের এই আশাবাদ একা নয়। প্রযুক্তি জগতের বড় নামগুলো এআই নিয়ে আরও বড় ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। নোবেল বিজয়ী ও গুগল ডিপমাইন্ডের চেয়ারম্যান ডেমিস হাসাবিস ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে এআই স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি ও মহাকাশের মতো শিল্পকে আমূল বদলে দিতে পারে। তিনি ফরচুনকে বলেন, “১০-১৫ বছরের মধ্যে আমরা আবিষ্কারের এক নতুন স্বর্ণযুগে প্রবেশ করব, যা এক ধরনের নতুন রেনেসাঁ।” রোগ নিরাময়ের পাশাপাশি তিনি মনে করেন, ফিউশন বা সৌরশক্তির অগ্রগতির মাধ্যমে জ্বালানি সংকট সমাধানে নতুন উপকরণ আবিষ্কারে সহায়তা করবে এআই এবং শেষ পর্যন্ত মানবজাতি “তারাদের ভ্রমণ এবং গ্যালাক্সি অন্বেষণ” করতে পারবে।

এলন মাস্ক এআই-এর প্রভাব নিয়ে আরও বেশি আশাবাদী। টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী বিশ্বাস করেন, অগ্রগতি এতটাই বড় হবে যে পণ্যদ্রব্য প্রাচুর্য হবে এবং অর্থ প্রধান বিষয় হয়ে উঠবে না। বিশ্বের ধনী ব্যক্তি পিটার ডায়ামান্ডিসের পডকাস্টে বলেন, “১০-২০ বছর পর অবসরের জন্য অর্থ জমানোর চিন্তা করবেন না, এটা কোনো বিষয় হবে না।”

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়, বিশেষ করে জনগণের মধ্যে সংশয়। অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই সম্প্রতি এক্স-এ স্বীকার করেছেন যে এআই-এর প্রতিশ্রুতি জনগণের কাছে ফাঁপা শোনাতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে বলা যে এআই ক্যান্সার নিরাময় করবে—এটি অনুপ্রেরণার চেয়ে ক্লিশে হয়ে গেছে এবং বেশিরভাগ মানুষ মনে করে এটি প্রতারণামূলক। আসলে কাজ করবে ক্যান্সার নিরাময় করা।” তিনি আরও বলেন, “অ্যানথ্রপিকসহ এআই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে নির্ভুল সমালোচনা হলো আমরা বিশ্বের উপকারের জন্য আমাদের বড় প্রতিশ্রুতি পূরণ করিনি। এটি সম্পূর্ণ আমাদের দোষ।”