প্রায় ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য নিয়ে বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কোম্পানি আলফাবেট। কিন্তু এই নামটি চূড়ান্ত করার আগে প্রতিষ্ঠাতারা কোনো বাজার পরীক্ষা বা মার্কেট টেস্ট চালাননি। প্রতিষ্ঠার ২২ বছর পর গুগলের আইপিওর বার্ষিকীতে ফরচুনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কোম্পানির সেই ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠাতাদের সিদ্ধান্তের নেপথ্য কাহিনি।
১৯৯৮ সালে সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে যাত্রা শুরু করা গুগলের নামকরণ হয়েছিল 'গুগল' শব্দ থেকে, যা গণিতের 'গুগল' (১ এর পরে ১০০টি শূন্য) থেকে নেওয়া। প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন শুরু থেকেই কোম্পানিটির অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখেছিলেন। ফরচুনের ২০২৬ সালের সবচেয়ে উদ্ভাবনী কোম্পানির তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে আলফাবেট। সার্চ, ইউটিউব, ক্লাউড কম্পিউটিং, ওয়েমো, প্রাইভেট ইকুইটি এবং ডিপমাইন্ড এআই গবেষণা — চারটি মূল খাতে বিভক্ত হয়ে কাজ করছে এই প্রতিষ্ঠান।
ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার্স ইনডেক্স অনুযায়ী, প্রায় ২৯৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক ল্যারি পেজ বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী ব্যক্তি। ১৯৯৭ থেকে ২০০১ সাল এবং ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গুগলের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৯ সাল পর্যন্ত আলফাবেটের সিইও ছিলেন পেজ, এরপরও তিনি কোম্পানির বোর্ড সদস্য ও শেয়ারহোল্ডার হিসেবে রয়েছেন। সহ-প্রতিষ্ঠাতা ব্রিন কার্যত কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে আছেন, যিনি সম্প্রতি কোম্পানির এআই প্রচেষ্টায় আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছেন। বিশ্বের চতুর্থ ধনী ব্যক্তি ব্রিনের সম্পদের পরিমাণ ২৭৪ বিলিয়ন ডলার।
২০১১ সালে, জীবনের শেষ প্রান্তে থাকা অবস্থায় অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস তার পরামর্শদাতা ল্যারি পেজকে কিছু স্পষ্টবক্তব্য জানিয়েছিলেন। জবসের জীবনীকার ওয়াল্টার আইজ্যাকসনের মতে, জবস তখন পেজকে ফোকাসের ওপর জোর দিতে বলেছিলেন। জবসের ভাষ্য ছিল, 'আমি প্রধান যে বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছিলাম তা হলো ফোকাস। এখন তোমার কার্যক্রম সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। কোন পাঁচটি পণ্যে মনোযোগ দিতে চাও? বাকিগুলো বাদ দাও, কারণ সেগুলো তোমাকে পিছিয়ে টানছে। এগুলো তোমাকে মাইক্রোসফটে পরিণত করছে। এ কারণে তোমার পণ্যগুলো মানসম্মত না হয়ে শুধু পর্যাপ্ত হয়ে উঠছে।'
পরে ২০১৫ সালে ফরচুনের গ্লোবাল ফোরামে পেজ স্বীকার করেন, জবসের কথাটি সঠিক ছিল। তিনি বলেন, 'জবস ঠিকই বলেছিলেন।' প্রথম দিকে পেজ তার সেই পরামর্শ মেনে নিয়েছিলেন এবং কর্মীদের অ্যান্ড্রয়েড পণ্য ও বর্তমানে বিলুপ্ত গুগল+ প্ল্যাটফর্মে মনোযোগ দিতে বলেছিলেন। তবে আলফাবেটের পরিকল্পনা ছিল আরও বৃহত্তর কিছু। গ্লুকোজ মনিটরিং কন্টাক্ট লেন্সের মতো ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলোর জন্য একটি ছাতা কোম্পানি হিসেবে আলফাবেট তৈরি হয়েছিল। পেজ মনে করতেন, তার প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগগুলো পরস্পর সম্পর্কিত এবং শক্তি, টেলিযোগাযোগ ও পরিবহন — সবকিছুই এই ছাতার আওতায় আসতে পারে। ২০১৪ সালে খোসলা ভেঞ্চারসের এক আলোচনায় পেজ বলেছিলেন, 'এত বড় কোম্পানি হয়ে মাত্র পাঁচটি জিনিস করা বোকামি।'
আলফাবেটের নাম ও উদ্দেশ্য নিয়ে পেজ ও ব্রিন এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে তারা কোনো বাজার জরিপও করাননি। পেজ বলেছিলেন, 'আমি এমন একটি নাম চেয়েছিলাম যেটির জন্য মানুষ গর্ববোধ করে কাজ করবে। কিন্তু আমি আসলে এটি খুব আকর্ষণীয় হতে চাইনি, কারণ ধারণাটি ছিল গুগলের মতো ভোক্তা ব্র্যান্ড নয়, বরং কোম্পানিগুলো যাতে অংশ নিতে পারে এমন একটি ব্র্যান্ড তৈরি করা।' আলফাবেট আসলে কর্মী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ব্র্যান্ড, তবে নামটি নিয়ে কৃতিত্ব নিতে রাজি নন পেজ। তিনি বলেন, 'আমি গুগল নামটি বেছে নিয়েছিলাম, তাই সের্গেই আলফাবেট বেছে নিয়েছিল।'




