বর্তমান করপোরেট জগতে নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে 'সফট স্কিল' বা কোমল দক্ষতার গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সত্য নাদেলা মনে করেন, সহমর্মিতাকে (empathy) এই সাধারণ ক্যাটাগরিতে ফেলে দেওয়াটা ভুল। তাঁর মতে, অন্য মানুষের অনুভূতি ও পরিস্থিতি বুঝতে পারার এই ক্ষমতাটি আসলে সবচেয়ে কঠিন দক্ষতা, যা একজন মানুষের অর্জন করতে হয়।
অ্যাক্সেল স্প্রিংগারের সিইও ম্যাথিয়াস ডপফনারের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে নাদেলা জানান, সহমর্মিতাকে 'সফট স্কিল' বলা হলে এর প্রকৃত গুরুত্ব অনেক সময় কমে যায়। তিনি বলেন, পৃথিবীর সাথে এবং আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলোর সাথে সংযোগ স্থাপন করার এই ক্ষমতাটিই আমাদের শেখার সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে, কেবল কর্মীদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন নয়, বরং গ্রাহকদের সাথে গভীর সংযোগ স্থাপনের জন্যও এই গুণটি অপরিহার্য। নাদেলা আরও উল্লেখ করেন যে, উদ্ভাবন বা ইনোভেশন মূলত গ্রাহকের সেইসব অপ্রকাশিত এবং অপূর্ণ চাহিদাগুলো পূরণ করার নাম, যা তারা হয়তো মুখে বলেন না। আর এই গোপন চাহিদাগুলো বোঝার একমাত্র মাধ্যম হলো সহমর্মিতা, যাকে তিনি 'ডিজাইন থিঙ্কিং'-এর মূল ভিত্তি হিসেবে দেখেন।
২০১৪ সালে মাইক্রোসফটের হাল ধরার পর থেকেই নাদেলা কর্মক্ষেত্রে সহমর্মিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। লিঙ্কডইন-এর একটি পডকাস্টে তিনি বলেছিলেন, কর্মীদের প্রতি সহমর্মিতা থাকলে তারা তাদের সেরা কাজগুলো করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি নিশ্চিত করে। তাঁর এই জীবনদর্শন গড়ে ওঠার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে তাঁর প্রয়াত পুত্র জেইন। জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী জেইনের বাবা হিসেবে নাদেলা এবং তাঁর স্ত্রী প্রতিনিয়ত প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। ২০১৭ সালে একটি পোস্টে তিনি স্বীকার করেন যে, তাঁর স্ত্রীর সহমর্মিতাবোধ তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, একজন বাবা বা একজন সিইও—যেকোনো ভূমিকাতেই দৈনন্দিন কাজে সহমর্মিতাকে যুক্ত করলে তা অত্যন্ত শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের বাবা হওয়া তাঁর ব্যক্তিগত দর্শন এবং নতুন ধারণাকে মানুষের সাথে সংযুক্ত করার তাড়নাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
পেশাগত জীবনের পাশাপাশি সত্য নাদেলা তাঁর শৈশবে ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি মনে করেন, দলগত খেলা একজন মানুষকে আদর্শ নাগরিক এবং দক্ষ নেতা হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এই বিষয়ে সাবেক ক্রিকেটার জহির খান একমত হয়ে বলেন, ক্রিকেটে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অহংকারের বদলে নম্রতার প্রয়োজন হয়, যা নাদেলার করপোরেট সাফল্যে প্রতিফলিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা খেলাধুলায় সক্রিয় থাকে, তাদের এমবিএ করার সম্ভাবনা এবং উচ্চপদে আসীন হয়ে বেশি আয় করার প্রবণতা অন্যদের চেয়ে বেশি থাকে, কারণ মাঠের লড়াই তাদের যোগাযোগ দক্ষতা ও দলগত কাজের অভিজ্ঞতা দেয়।
করপোরেট সংস্কৃতিতে সহমর্মিতার প্রয়োজনীয়তা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে মহামারীর সময়ে যখন কর্মীরা একাকীত্ব এবং পারিবারিক চাপে ভুগেছে, তখন তাদের এমন নেতার প্রয়োজন ছিল যারা কথা শুনতে পারে এবং সহানুভূতি দেখাতে পারে। লিঙ্কডইনের ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের ৬১ শতাংশ কর্মী মনে করেন কর্মক্ষেত্রে সফট স্কিলগুলো হার্ড স্কিল বা কারিগরি দক্ষতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াং-এর ২০২১ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী মনে করেন, সহমর্মী ম্যানেজার থাকলে তাদের কাজের সন্তুষ্টি, উৎপাদনশীলতা এবং আনুগত্য বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, অর্ধেকের বেশি কর্মী জানিয়েছেন, তারা কেবল বসের সহমর্মিতার অভাবের কারণেই চাকরি ছেড়েছেন।




