চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে নয়জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা তিন দিন অতিক্রম করলেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। আজ সোমবার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খানের নেতৃত্বে একটি বিশেষায়িত দল ঘটনাস্থলের তদন্ত শুরু করেছে। এর আগে গঠিত তিনটি তদন্ত কমিটির কোনো সদস্যই জাহাজটির কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হননি।
শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন—এই তিনটি পক্ষ থেকে শুক্রবারই পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষে অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজীকে প্রধান করে ১১ সদস্যের একটি দল গঠন করা হয়। একই দিনে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হককে দায়িত্ব দিয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ৯ সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করেন। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতা ও বিস্ফোরণের আশঙ্কায় এই কমিটিগুলোর কেউই ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে পারেননি।
এই পরিস্থিতিতে গতকাল রোববার সন্ধ্যায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. আরিফুল ইসলাম প্রিন্সের স্বাক্ষরিত একটি আদেশে আট সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান হিসেবে বুয়েটের অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খানকে মনোনীত করা হয়েছে। অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ক্যাপ্টেন মো. শোয়েব আহমদ এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান। বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গতকাল বিকেলে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, জাহাজের ভেতরের যেসব চেম্বারে এখনও গ্যাস রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেগুলোর পরিমাণ, অবস্থান ও প্রকৃতি নির্ধারণ এবং লিকেজের উৎস চিহ্নিত করে বন্ধ করার বিষয়ে সুপারিশ দেবে বিশেষজ্ঞ দল। কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আজ থেকেই তারা কাজ শুরু করেছেন।
মহাপরিচালক শফিউল আলম তালুকদার প্রথম আলোকে জানান, হাইড্রোজেন সালফাইড অত্যন্ত বিষাক্ত এবং বাতাসের চেয়ে ভারী। ফলে এই গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে আরও কারো মৃত্যু না ঘটে, সে বিষয়টি মাথায় রেখেই তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখনও দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজে যেতে পারেননি। আগে সম্ভাব্য সব স্থানের গ্যাস মুক্ত করা হবে। বিশেষজ্ঞ দলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের কোনো দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও গ্যাসমুক্তকরণের কাজে ডাকা হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন। কিন্তু গ্যাস লিকেজের সুনির্দিষ্ট উৎস ও কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অন্য কোনো গ্যাস আছে কি না এবং থাকলে তার পরিমাণ কত—তাও জানা সম্ভব হয়নি। গ্যাসের নমুনা সংগ্রহও করা যায়নি। এই কারণেই মূলত তদন্তকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম গতকাল বিকেলে বিশেষজ্ঞ কমিটি পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, লিকেজ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়েছে কি না, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনাটি ঘটে গত শুক্রবার সকাল নয়টার দিকে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর স্টেশন রোডের ফেরদৌস স্টিল কারখানায়। স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে এবং নয়জন শ্রমিক নিহত হন। সেখানে থাকা শ্রমিক শুভ জলদাস প্রথম আলোকে জানান, জাহাজটির এলএনজি ট্যাংক কাটার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। জাহাজের তলায় থাকা একটি ট্যাংক কাটার সময়ই ওই ট্যাংক থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে প্রাণহানি ঘটে।




