রাজধানীর মিরপুর ১৩ নম্বরের সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এখন রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। মাত্র ১০ টাকায় চিকিৎসাসেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ায় দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা ছুটে আসছেন। গত মাসের শেষ দিকে 'লাইফ স্টোরি' নামের একটি ফেসবুক পেজে হাসপাতালটি নিয়ে প্রচারিত একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই এই চিত্র। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে উঠেছে।
চাঁদপুর থেকে আসা ৫৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর দীর্ঘদিন ধরে পায়ের ব্যথায় ভুগছেন। ভিডিও দেখে তিনিও চিকিৎসার আশায় ঢাকায় এসেছিলেন। তবে সকাল ছয়টায় টোকেন নিয়েও দশটা বাজার পর তাঁর দেখা মেলে। চিকিৎসক জানান, রোগীর চাপ অনেক বেশি, তাই নতুন করে থেরাপির সিরিয়াল দেওয়া সম্ভব নয়। শুধু ওষুধ লিখে দিয়ে দুই মাস পর যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ জাহাঙ্গীর প্রশ্ন তুলেছেন, ১৮০০ টাকার ওষুধ কিনতে হলে ৫০০ টাকা ভাড়া দিয়ে ঢাকায় আসার অর্থই বা কী!
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগে এখানে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ জন রোগী চিকিৎসা নিতেন। ভাইরাল ভিডিওর পর সেই সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সকাল থেকে টিকিটের সারি হাসপাতাল ভবনের বাইরে অবধি পৌঁছে গেছে। বহির্বিভাগে আকুপাংচার চিকিৎসার জন্য যে আগাম সিরিয়াল দেওয়া হয়, তা এখন আগামী বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ঠেকেছে।
বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। সহকারী অধ্যাপক সোহরাব হোসেন জানান, হুট করে এত রোগী বেড়ে যাওয়ায় সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। আকুপাংচার, হিজামা, পঞ্চকর্ম ও যোগব্যায়ামের মতো থেরাপি দিতে গিয়ে চিকিৎসকদের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছে। অন্যদিকে, সরকারি সরঞ্জামের স্বল্পতার কারণে আকুপাংচারের জন্য প্রয়োজনীয় নিডল ও জীবাণুনাশক রোগীদের নিজেদেরই কিনতে হচ্ছে। এতে রোগীদের খরচও বেড়ে যাচ্ছে প্রায় এক হাজার টাকা পর্যন্ত। অধিকাংশ ওষুধও নিজেদেরই কিনতে হচ্ছে।
নোয়াখালী থেকে আসা মাহমুদা খাতুন (৪০) জানান, ফেসবুকে ভিডিও দেখে তিনি এসেছেন। তবে এত ভিড় হবে বুঝতে পারেননি। প্রথম দিন চিকিৎসা করাতে না পেরে ফিরে গেলেও আত্মীয়ের বাসায় থেকে পরদিন আবার এসেছেন। এত দূর থেকে এসেছেন, তাই কষ্ট হলেও চিকিৎসক দেখিয়ে তবেই ফিরবেন বলে জানান তিনি।
হাসপাতালটিতে ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক—এ দুই শাখা মিলিয়ে ৪৫ জন শিক্ষক ও চিকিৎসক কর্মরত। ইন্টার্ন চিকিৎসক মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, অনেক রোগী এসে ঘুরে যাচ্ছেন এবং হয়রানির অভিযোগ করছেন। কিন্তু তাঁদের ধারণক্ষমতা ও লোকবল যে কম, সেটা কেউ বুঝতে চান না। এই ভিডিও তারা করেননি, ফেসবুকে দেননি—তবুও পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে।
প্রায় ৪০ বছর ধরে হাসপাতালটিতে কর্মরত অফিস সহকারী শামসুর রহমান জানান, রোগীর এমন ভিড় তিনি আগে কখনো দেখেননি। বেলা তিনটা পর্যন্ত টিকিট দিতে হচ্ছে, চিকিৎসকরা বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত থাকছেন, তবুও সব রোগী দেখা সম্ভব হচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, এখানকার শিক্ষক-চিকিৎসকদের ২৫ মাস ধরে বেতন-ভাতা বন্ধ আছে। এরপরও সবাই কাজ করে যাচ্ছেন। এখন কাজের চাপ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় কর্মঘণ্টার বাইরেও সেবা দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে তাঁরা গভীর হতাশায় রয়েছেন।




