একসময় ময়মনসিংহ অঞ্চলের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও যোগাযোগব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র ছিল নদী নেটওয়ার্ক। হিমালয় থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্রকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য শাখা নদী, উপনদী, খাল ও প্লাবনভূমি। কিন্তু বিগত তিন দশকে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য নিষ্কাশন, নদী অববাহিকা দখল এবং খননকাজে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সেই বিশাল জলতন্ত্র এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রশাসন উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী চার জেলার নদ-নদীর একটি তালিকা প্রস্তুত করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠায়। সেই তালিকায় মোট ১৭৯টি নদ-নদী রয়েছে; এর মধ্যে নেত্রকোনায় ৯৪টি, জামালপুরে ১৫টি, শেরপুরে ১১টি এবং ময়মনসিংহ জেলায় ৫৯টি। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে, এই নদীগুলোর অধিকাংশই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথে। বছরের আট মাসই কোনো কার্যকর পানির প্রবাহ থাকে না; শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোর বুক শুকিয়ে বালুচরে পরিণত হয়, যেখানে স্থানীয় মানুষেরা ফসল চাষ করেন। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, প্রশাসন বা পাউবোর কাছে এই সংকটাপন্ন নদীগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি তালিকা নেই। তবে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) নিজস্ব মাঠপর্যায়ের গবেষণায় ব্রহ্মপুত্র, সোমেশ্বরী, মহাদেও, সুতিয়া, সুতিখালী, খিরু, বানার, আইমান ও মগড়া—এই ৯টি নদীকে ‘সবচেয়ে বেশি সংকটাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বেলার কর্মশালায় নদী বাঁচাতে ২১টি জরুরি সুপারিশ করা হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল সিএস ম্যাপ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ, উৎসমুখের বাঁধ অপসারণ এবং প্রবাহ বিঘ্নকারী অবকাঠামো ভেঙে ফেলা; কিন্তু বাস্তবে সেই সুপারিশগুলো আলোর মুখ দেখেনি।
ভালুকা ও ত্রিশাল উপজেলাকে ময়মনসিংহের শিল্পায়নের কেন্দ্রবিন্দু বলা হয়। টেক্সটাইল, ডাইং, গার্মেন্টস ও সিরামিক শিল্পের দ্রুত বিকাশ এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করলেও স্থানীয় নদ-নদীর জন্য তা অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের লাউতি খাল মল্লিকবাড়ি এলাকায় গিয়ে মিশেছে ঐতিহাসিক খিরু নদে। সরেজমিনে দেখা গেছে, শিল্পকারখানার অবিরাম বর্জ্যের কারণে লাউতি খালের পানি এখন কুচকুচে কালো; সেই বিষাক্ত পানি খিরু নদে মিশে পুরো নদের পানির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট করছে। নদীর পাড়ে তীব্র ঝাঁজালো রাসায়নিক গন্ধে পাঁচ মিনিটের বেশি দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব, আর পানিতে মাঝেমধ্যেই ক্ষতিকর গ্যাসের বুদবুদ উঠতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দুই দশক আগেও লাউতি খাল ও খিরু নদ ছিল স্বচ্ছ পানির উৎস। অন্যদিকে, ত্রিশালের সাইনবোর্ড এলাকায় বানার নদ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ‘দুধের মতো সাদা’ পানি; এটি কোনো প্রাকৃতিক সাদা পানি নয়, বরং উজানে সিরামিক কারখানার রাসায়নিক মিশ্রিত তরল বর্জ্য। কারখানার উৎপাদন চক্রের ওপর নির্ভর করে এই পানির রং কখনো নীল, কখনো লাল, আবার কখনো গাঢ় বেগুনি হয়। এই দূষিত পানি শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিশছে শীতলক্ষ্যা নদীতে, ফলে আঞ্চলিক দূষণ এখন ঢাকার চারপাশের নদীব্যবস্থাকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।
দূষিত পানির কারণে লাউতি খাল ও খিরু নদের পাড়ের কৃষকদের সেচের বিকল্প নেই। ভূগর্ভস্থ পানি তোলার খরচ বেশি হওয়ায় তাঁরা বাধ্য হয়ে নদ ও খালের রাসায়নিকযুক্ত পানিতে ফসলের জমিতে সেচ দিচ্ছেন। হবিরবাড়ি গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী কৃষক মোস্তফা কামাল জানান, কারখানার বর্জ্যমিশ্রিত কালো পানি জমিতে দিলে ধানের গোড়া পচে যায় এবং চালের মান খারাপ হয়ে যায়। ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান জানান, ভরাডোবা, হবিরবাড়ি ও মল্লিকবাড়ি ইউনিয়নে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে; শুধু ভরাডোবা ইউনিয়নেই প্রায় ৩৫০ একর ধানের জমি আবাদের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। টেক্সটাইল ও ডাইং মিলের রাসায়নিক মিশ্রিত তরল বর্জ্য সরাসরি কৃষি জমিতে প্লাবিত হচ্ছে, ফলে মাটিতে লেড, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে এবং মাটির জৈব গুণাগুণ ও অণুজীব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ভালুকার মাটি দেশি-বিদেশি ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল, কিন্তু এভাবে দূষণ চলতে থাকলে ফল চাষের বিপ্লব অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। মৎস্য সম্পদের চিত্রও শোচনীয়। ভালুকা উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান জানান, শিল্পবর্জ্যের কারণে পানিতে জৈব রাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা ও রাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে গেছে; ফলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা শূন্যের কাছাকাছি, আর অ্যামোনিয়া ও পিএইচের মাত্রা সহনশীল সীমার চেয়ে অনেক বেশি। এই পরিবেশে কোনো মাছ বা জলজ প্রাণী বাঁচতে পারে না; খিরু ও সুতিয়া এখন জৈবিকভাবে ‘মৃত জলধারা’। ২০১২ সালে ভালুকা উপজেলার ২ হাজার ১ জন জেলেকে নিবন্ধিত করা হলেও নদীদূষণের কারণে গত এক দশকে এই পরিবারগুলোর জীবন বিপর্যস্ত; অনেকে পৈতৃক পেশা ছেড়ে রিকশা চালানো, দিনমজুর বা মাছের খামারে কাজ নিতে বাধ্য হয়েছেন। ধামসূর গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী সামলাল রবি দাস স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘আমরা চৈত্র মাসের কড়া গরমেও এই খিরু নদের পানি হাত দিয়ে তুলে তৃষ্ণা মিটিয়েছি। নদের পানি এত পরিষ্কার ছিল যে তলার বালু দেখা যেত। এখন এই পানির দিকে তাকানো যায় না, দুর্গন্ধে নদের পাড় দিয়ে হাঁটা যায় না। আমাদের চোখের সামনে নদটা মরে গেল।’
দূষণের প্রভাব পড়েছে জনস্বাস্থ্যেও। ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম জানান, বহির্বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বড় অংশই চর্মরোগী; তীব্র চুলকানি, একজিমা, অ্যালার্জি ও দীর্ঘমেয়াদি ঘা নিয়ে শত শত কৃষক ভুগছেন। পেটের পীড়া, গ্যাস্ট্রিক ও আমাশয়ের প্রাদুর্ভাবও অনেক বেশি। দীর্ঘ সময় রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকলে লিভার ও কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায় বলে তিনি জানান। ২০২৪ সালের শেষের দিকে ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রশাসন ব্রহ্মপুত্র, খিরু, সুতিয়া, মগড়া, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও মহারশি—এই ছয়টি নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে ১ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছিল, কিন্তু দেড় বছর পরেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো প্রতিফলন নেই। ২০১৯ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন প্রকাশিত তালিকায় ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় ৩ হাজার ৩৮৫ জন অবৈধ নদী দখলদার রয়েছে; এর মধ্যে ময়মনসিংহ জেলাতেই ২ হাজার ১৬০ জন। দখলদারদের মধ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, সরকারি প্রতিষ্ঠান এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়ও রয়েছে। ময়মনসিংহ নগরের পাটগুদাম সেতু এলাকায় নদের দুই পাশ ভরাট করে গড়ে উঠেছে পাকা ঘরবাড়ি ও দোকানপাট; বিশাল নদটি সেখানে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। ঈশ্বরগঞ্জে খোদ পৌরসভাই কাঁচামাটিয়া নদে প্রতিদিনের বর্জ্য ফেলছে। উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়ে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার জন কেনেডি জাম্বিল জানান, জেলা প্রশাসনগুলো নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে; তবে তিনি নতুন পদে এসেছেন বলে অগ্রগতি সম্পর্কে জানেন না।
বিআইডব্লিউটিএ ২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের নাব্যতা উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে; গাইবান্ধা, জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও কিশোরগঞ্জ—এই পাঁচ জেলায় ২২৭ কিলোমিটার অংশ খননের কাজ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন করা হয়েছে। বর্তমানে কাজ প্রায় ৪৬ শতাংশ শেষ। বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মহসিন মিয়া জানান, নিচের দিকে যতই খনন করা হোক, ব্রহ্মপুত্রের উৎসমুখ (গাইবান্ধা ও জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ এলাকা) সচল না থাকলে পানি আসবে না; উৎসমুখের প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকা পলি জমে বন্ধ হয়ে আছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সরকার এখন উৎসমুখ থেকে ৭০ কিলোমিটার নদ খননের কাজ সেনাবাহিনীকে হস্তান্তর করেছে; গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে সেনাবাহিনী ড্রেজিংয়ের কাজ শুরু করেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা জানান, ইটিপি সঠিকভাবে চলছে কি না তা পর্যবেক্ষণে কারখানাগুলোতে আইপি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। রঙিন পানির বিষয়ে তিনি বলেন, ২০২৩ সালের আগে রঙিন পানির কোনো বৈজ্ঞানিক স্ট্যান্ডার্ড ছিল না; নতুন বিধিমালায় স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করা হলেও কারখানাগুলোকে ‘যৌক্তিক সময়’ দিতে হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, বিধিমালার তিন বছর পেরিয়ে গেছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) অধ্যাপক ড. খালিদ মাহমুদের গবেষণায় ১৯৮১–২০১৭ সময়ে ময়মনসিংহে নদের গড় প্রবাহ কমার সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও গভীরে যাওয়ার প্রবণতা পাওয়া গেছে। তিনি মনে করেন, টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য নদীপ্রবাহ, রিচার্জ জোন, বিলঝিল, সেচ-পাম্পিং এবং শুষ্ক মৌসুমের পানি ব্যবহারকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। বাকৃবির আরেক গবেষক অধ্যাপক ড. দীন ইসলাম ভালুকা এলাকায় দুই বছর মেয়াদি গবেষণায় দেখেছেন, উপরিভাগের দূষণ এখন মাটির নিচের পানির স্তরকেও আক্রান্ত করতে শুরু করেছে; এখনো ভূগর্ভস্থ পানি পুরোপুরি বিপজ্জনক না হলেও কয়েক বছরের মধ্যে তা পানের অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে। তার মতে, একমাত্র সমাধান—শিল্পকারখানার ব্যবহৃত পানি শতভাগ দূষণমুক্ত করে তবেই প্রকৃতিতে ছাড়া।




