ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটসের প্রতিষ্ঠাতা রে ডালিও এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় হেজ ফান্ডগুলোর একটি পরিচালনা করছেন। কিন্তু এই সাফল্যের অনেক আগে, আশির দশকের গোড়ার দিকে তিনি একটি সাধারণ ব্যবসায়িক সমস্যার সমাধান দিচ্ছিলেন — মুরগি পালনের খরচ। ডালিওর দাবি, ম্যাকডোনাল্ডসের জনপ্রিয় পণ্য চিকেন ম্যাকনাগেটস বাজারে আনার পেছনে তার এই বিশেষজ্ঞ মতামতই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল।
সেই সময়ে অস্থির মুরগির বাজারের মধ্যে ম্যাকডোনাল্ডস নাগেটের দাম নির্ধারণ এবং মেনু মূল্যের ওঠানামার ঝুঁকি সীমিত করার চেষ্টা করছিল। মুরগির খাদ্যের দাম হঠাৎ বদলে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে নাগেটের দাম ঠিক করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। এই সমস্যা সমাধানের জন্যই এক তরুণ পরামর্শক হিসেবে ডালিওকে নিয়োগ দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
১৯৭৭ সালে, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের একটি প্রতিবেদনের পর মার্কিন সরকার খাদ্যতালিকা সংক্রান্ত লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে, যেখানে আমেরিকানদের 'মাংস খাওয়া কমিয়ে হাঁস-মুরগি ও মাছ খাওয়া বাড়ানোর' আহ্বান জানানো হয়। একই সময়ে হৃদরোগ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় অনেকেই স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে ওঠেন। রেড-মিট বার্গার চেইন হিসেবে পরিচিত ম্যাকডোনাল্ডস সরকারি এই পরামর্শ মেনেই মুরগির দিকে ঝুঁকে পড়ে। ১৯৮১ সালে তারা চিকেন 'এন' চিপস চালু করে, যেখানে ছিল ফ্রাই এবং বোনলেস চিকেনের টুকরো। তবে এই খাবারটি পরে বাদ পড়ে এবং জায়গা দখল করে ম্যাকনাগেটস।
১৯৭০-এর মাঝামাঝি সময়ে আমেরিকানরা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করত গরুর মাংস, তারপর শুয়োরের মাংস এবং তৃতীয় স্থানে ছিল মুরগি। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে এসে গরুর মাংস ও মুরগির জনপ্রিয়তার জায়গা বদলে যায়। এই পরিবর্তনের সূচনা ঘটে আশির দশকের শুরুর দিকে, যখন ম্যাকডোনাল্ডস ডালিওর কাছে আসে। কৃষিপণ্যে বিশেষ দক্ষতা থাকায় এবং শিয়ারসন হেডেন স্টোনে কাজ করার সময় গবাদিপশু পালনকারী ও ফসল উৎপাদনকারীদের ঝুঁকি মোকাবিলার পরামর্শ দেওয়ার অভিজ্ঞতা থাকায় ডালিওই ছিলেন এই কাজের উপযুক্ত প্রার্থী।
সেসময় ডালিও সবেমাত্র ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটস গড়ে তুলছিলেন এবং তার ক্লায়েন্ট ছিল আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ পোল্ট্রি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ম্যাকডোনাল্ডসের কাজ পেতে এই পরিচিতিই কাজে লাগে। গত বছর ব্লুমবার্গের 'অড লটস' পডকাস্টে ডালিও বলেন, "আমি আমার মুরগি উৎপাদনকারী ক্লায়েন্ট এবং ম্যাকডোনাল্ডসের কাছে গিয়েছিলাম, এবং দেখিয়েছিলাম কীভাবে এই ক্লায়েন্ট দাম হেজ করে স্থিতিশীল দাম দিতে পারে। এর কারণেই তারা মেনুতে চিকেন ম্যাকনাগেটস রাখতে পেরেছিল।"
ডালিও ব্যাখ্যা করেন, মুরগির খাদ্য — যা মূলত সয়াবিন ও ভুট্টা দিয়ে তৈরি — এই জনপ্রিয় স্ন্যাকস উৎপাদনে সবচেয়ে ব্যয়বহুল উপাদান। ছানা নিজে তেমন দামি নয়, তবে সয়ামিল ও ভুট্টার দাম ছিল অস্থির। ডালিওর পরামর্শ ছিল এই দুই উপাদানকে একত্রিত করে একটি সিন্থেটিক ফিউচার তৈরি করা — আর এই কৌশলই সফলতা এনে দেয়। ২০২২ সালে ব্লুমবার্গের 'মাস্টার্স ইন বিজনেস' পডকাস্টে তিনি বলেন, "মুরগির দামের সঙ্গে ছানার দামের কোনো সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক আছে ছানাকে খাওয়ানো শস্যের দামের সঙ্গে।"
১৯৮৩ সালে ম্যাকডোনাল্ডস চিকেন ম্যাকনাগেটস চালু করে এবং কয়েক মাসের মধ্যেই একসময়ের লাল মাংসভিত্তিক এই চেইনটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুরগির খুচরা বিক্রেতায় পরিণত হয়। আজ প্রতিষ্ঠানটি বছরে ৭০০ মিলিয়ন পাউন্ড নাগেট বিক্রি করে। ডালিওর এই দক্ষতাই তাকে এবং ব্রিজওয়াটারকে খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দেয় — তবে বিলিয়নেয়ার নিজেকে চিকেন ম্যাকনাগেটসের স্রষ্টা বলতে চান না, এমন বলাটাকে তিনি 'অতিরঞ্জিত' মনে করেন।
এখন ৭৭ বছর বয়সী ডালিও ১৯৭৫ সালে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে স্নাতক হওয়ার দুই বছর পর নিউইয়র্ক সিটির দুই বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ব্রিজওয়াটার প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠানটি তার আগের ওয়াল স্ট্রিট ক্যারিয়ার থেকে পরিচিত কর্পোরেট ক্লায়েন্টদের পরামর্শ দিত। ম্যাকডোনাল্ডসের কাজটি ব্রিজওয়াটারের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সুনাম বাড়িয়ে তোলে এবং পরে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আদায়ে সহায়তা করে — যা ছিল তাদের প্রথম বড় বিনিয়োগ।
প্রতিষ্ঠান বড় হতে থাকলে ১৯৮১ সালে ডালিও ব্রিজওয়াটারকে কানেকটিকাটের উইলটনে স্থানান্তর করেন, যেখানে একটি রূপান্তরিত শস্যাগারই ছিল অফিস ও বাসস্থান। ২০১৭ সালে প্রকাশিত 'প্রিন্সিপালস: লাইফ অ্যান্ড ওয়ার্ক' বইয়ে তিনি এই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। "মিড-১৯৮০-এর দশকে ব্রিজওয়াটারে প্রায় দশজন মানুষ ছিল, তাই আমি একটি বড় পুরনো ফার্মহাউস ভাড়া নিলাম," লিখেছেন ডালিও। "ব্রিজওয়াটার তার কিছু অংশ দখল করেছিল এবং আমার পরিবার বাকি অংশে থাকত। পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অনানুষ্ঠানিক: সবাই ড্রাইভওয়েতে গাড়ি পার্ক করত, আমরা রান্নাঘরের টেবিলে মিটিং করতাম, আর আমার বাচ্চারা টয়লেটে বসে দরজা খোলা রাখত।"
জুলাই পর্যন্ত ব্রিজওয়াটার ১০২ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ ব্যবস্থাপনা করছে এবং ২০২২ সালে ডালিওর কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়া নতুন সিইও নির বার দেয়ার অধীনে এআই-সমৃদ্ধ বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। "মহান অংশীদারিত্ব আসে সাধারণ মূল্যবোধ ও আগ্রহ ভাগ করে নেওয়া থেকে," লিখেছেন ডালিও। "যখন আমরা পাঁচজন ছিলাম, পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন; পঞ্চাশজন হওয়ার পর আরেক রকম; পাঁচশ, হাজারে পৌঁছানোর পরও বদলে গেছে। আমাদের মূল মূল্যবোধ আর নীতিমালা ছাড়া প্রায় সবকিছুই অচেনা হয়ে গেছে।"




