দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা টয়োটা ও ফক্সওয়াগনের মতো বৈশ্বিক গাড়ি নির্মাতাদের জন্য এখন বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে চীনের গাড়ি শিল্প। ইউরোপ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া—বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চীনা গাড়ির কদর বাড়ছে, আর এর জেরে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ডগুলো। তবে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারের চিত্রটি একদম উল্টো। সেখানে গত বছরের শেষ প্রান্তিক থেকে ধারাবাহিকভাবে কমছে বিক্রি। দীর্ঘদিনের দামের যুদ্ধ এবং ক্রেতাদের চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় দেশটির সবচেয়ে বড় গাড়ির বাজারে এখন বিপুল সংখ্যক গাড়ি অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে।

অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেই এখন চীনা নির্মাতাদের বিশ্ববাজারে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সাংহাইভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অটোমোবিলিটির প্রধান নির্বাহী বিল রুশো জানান, চীনা গাড়ি নির্মাতাদের উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেছে। অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা এবং আধুনিক পণ্য থাকার কারণে দেশের বাইরে ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তাদের জন্য শক্তিশালী অর্থনৈতিক তাগিদ রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ এখন তাদের জন্য কৌশলগতভাবে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

চায়না প্যাসেঞ্জার কার অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিসিএ) পরিসংখ্যান বলছে, গত জুলাইয়ে চীনের বাজারে মোট ১৪ লাখ ৭০ হাজার গাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ কম। টানা দশম মাসের মতো এই পতন অব্যাহত থাকলেও একই সময়ে রপ্তানি ৮৮ শতাংশ বেড়ে ৯ লাখ ২৩ হাজারে পৌঁছেছে। সংগঠনটির প্রধান কুই ডং শু এই মন্দার জন্য জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য এবং সাশ্রয়ী মূল্যের সাধারণ সেডান গাড়ির প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাওয়াকে দায়ী করেছেন। চীনের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থারই প্রতিফলন ঘটছে গাড়িশিল্পে—একদিকে কারখানা ও রপ্তানি চালু থাকলেও অন্যদিকে আবাসন খাতের দুর্বলতা এবং ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের কারণে দেশীয় বাজারে চাহিদা সংকুচিত হচ্ছে।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে গাড়ি বিক্রি প্রায় ২৩ লাখ ইউনিট বা ২০ শতাংশ কমেছে, যা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম বাজার জাপানের মোট নতুন গাড়ি নিবন্ধনের সমান। এই সময়ে চীনের গাড়ি রপ্তানি ৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এইচএসবিসির বিশ্লেষক ইউকিয়ান ডিংয়ের মতে, আগস্টের শেষ বা সেপ্টেম্বর থেকে নতুন মডেলের গাড়ি বাজারে এলে বিক্রি কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে, তবে খুব দ্রুত বাজার পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ।

চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে বিওয়াইডি ব্র্যান্ডের অভ্যন্তরীণ বিক্রি ৩৫ শতাংশ কমলেও রপ্তানি ৭৯ শতাংশ বাড়িয়ে তারা এই ঘাটতি পুষিয়ে নিয়েছে। ২০২৬ সালে ব্রাজিল ও যুক্তরাজ্য তাদের অন্যতম প্রধান বাজারে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে বিশ্বের শীর্ষ গাড়ি রপ্তানিকারক দেশের মর্যাদা ধরে রেখেছে চীন, যা জাপানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিল রুশো মনে করেন, জাপানের শক্তি ছিল উৎপাদন দক্ষতা, গুণমান ও জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে, কিন্তু চীনের শক্তি বহুমুখী—বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি, ব্যাটারি, আধুনিক সফটওয়্যার এবং দ্রুত নতুন পণ্য বাজারে আনার সক্ষমতা। ফলে বিশ্ববাজারে চীনের এই বিস্তার আগামী দিনে আরও গভীর প্রভাব ফেলবে।