সেকালে মক্কায় কাবাঘরের ওপর কোনো ছাদ ছিল না, উচ্চতা ছিল মাত্র ৯ হাত। ভয়াবহ এক বন্যায় কাবাঘরের দেয়াল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেইসময় মানতকারীদের স্বর্ণালংকার চুরি যাওয়া সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে সংস্কারের বিষয়টি জরুরি হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে কোরাইশ নেতারা একটি অনন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তারা ঠিক করেন, কাবা পুনর্নির্মাণে শুধুমাত্র হালাল অর্থ ব্যবহার করা হবে। কোনো অবস্থাতেই অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ, সুদ, বেশ্যাবৃত্তি বা ডাকাতির অর্থ এই কাজে লাগানো যাবে না। এটি ছিল আল্লাহর ঘরের প্রতি তাদের চরম শ্রদ্ধার নিদর্শন।
সংস্কার শুরুর আগে পুরোনো দেয়াল ভাঙার প্রশ্ন আসে। কে প্রথম আঘাত করবে, তা নিয়ে কোরাইশ নেতারা দ্বিধায় পড়ে যান। আবরাহার হস্তীবাহিনীর ওপর নেমে আসা অলীক পাখির শাস্তির কথা তাদের মনে ছিল। যদি আবার এমন কিছু ঘটে যায়? অনেক চিন্তার পর ওয়ালিদ ইবনে মুগিরাহ এগিয়ে আসেন। তিনি শাবল দিয়ে আঘাত করেন, কিন্তু কোনো গজব নেমে আসে না দেখে অন্যরাও কাজে যোগ দেয়। ইব্রাহিম (আ.)-এর ভিত্তি পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হয় কাবার পুরোনো দেয়াল। প্রতিটি গোত্রের জন্য আলাদা করে কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়। রোম থেকে বাকুম নামে একজন দক্ষ মিস্ত্রি আনা হয়, এবং মক্কাবাসী তাকে সহায়তা করতে থাকে।
কিছুদিন কাজ চলার পর সবচেয়ে জটিল সমস্যাটি দেখা দেয় যখন হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথরকে তার নির্দিষ্ট স্থানে বসানোর পালা আসে। এই পাথর স্থাপনের সম্মান নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে কোনো গোত্রই রাজি ছিল না। ফলে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। গোত্রপতিরা তলোয়ারে শাণ দিতে শুরু করেন। তারা জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন কিন্তু সম্মান ছাড়তে নারাজ। মাখজুম গোত্রের বর্ষীয়ান নেতা আবু উমাইয়া এই রক্তক্ষয়ী সংকটে বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি একটি সভা ডেকে নেতাদের কাছে প্রস্তাব দেন, আগামীকাল ভোরে যে প্রথম কাবাচত্বরে প্রবেশ করবে, তার হাতে মীমাংসার ভার দেওয়া হবে। সবাই তাঁর রায় মেনে নেবে।
আল্লাহর পরিকল্পনায়, পরদিন ভোরে সবার আগে কাবাচত্বরে পা রাখেন মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ (সা.), যিনি ততদিনে ‘আল-আমিন’ নামে পরিচিত। তাঁকে দেখে নেতারা আনন্দিত হন এবং তাঁকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মেনে নেন। মুহাম্মদ (সা.) একটি চাদর আনতে বলেন। তারপর পাথরটিকে চাদরের ওপর রেখে প্রত্যেক গোত্রপতিকে চাদরের প্রান্ত ধরতে আহ্বান জানান। সবাই মিলে পাথরটিকে কাবা দেয়ালের কাছে নিয়ে যান। এরপর তিনি নিজ হাতে পাথরটি তুলে নির্ধারিত স্থানে বসিয়ে দেন। এই অভিনব সমাধানে সব গোত্রপতিই হাজরে আসওয়াদ বহনের সম্মান লাভ করেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তায় মক্কাবাসী মুগ্ধ হয় এবং একটি অনিবার্য যুদ্ধ থেকে রক্ষা পায়।




