সৃষ্টিজগতের সব অস্তিত্বের উৎস এক, আর এ কারণেই সকল সত্যেরও উৎস একক। এমনই এক দার্শনিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ‘ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা’ নামক একটি চিন্তাধারা জ্ঞানকে ব্যাখ্যা করছে একক বাস্তবতার বহুমাত্রিক উপলব্ধি হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, সমগ্র মহাবিশ্ব যখন একটি অভিন্ন সৃষ্টিগত নিয়মের (নেজাম) অধীনে পরিচালিত, তখন সেই নিয়মকে জানার জন্য গৃহীত প্রতিটি সঠিক প্রচেষ্টাও পরিণামে একই পরম সত্তার ভিন্ন ভিন্ন স্তরে গিয়ে পৌঁছাবে। সুতরাং জ্ঞানের যে ঐক্য, তা কোনো আরোপিত বা কৃত্রিম সমন্বয় নয়; এটি অস্তিত্বের অভ্যন্তরীণ ঐক্যেরই জ্ঞানতাত্ত্বিক বহিঃপ্রকাশ।

এই ধারণার অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট। বাস্তবতা যখন অভিন্ন ও সমন্বিত, তখন তার সম্পর্কে অর্জিত জ্ঞান কখনোই পরস্পরবিরোধী হতে পারে না। প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, দৈনন্দিন মানবিক অভিজ্ঞতা এবং ঐশী প্রত্যাদেশ (ওহি) — এ সবকটিই একই মহাবাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন স্তর আমাদের সামনে খুলে ধরে। এদের মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যায়, তা সত্যের ভিন্নতার কারণে নয়; বরং তা উদ্ভূত হয় পর্যবেক্ষণের পরিসর, অনুসন্ধানের পদ্ধতি এবং ব্যাখ্যার ভিন্নতার কারণে। এখানে সত্য বলতে বোঝানো হয়েছে বাস্তবতার সাথে জ্ঞানের একটি নিখুঁত সঙ্গতি। আর সেই বাস্তবতার প্রতিটি স্তর — ভৌত, জৈবিক, সামাজিক, নৈতিক কিংবা আধ্যাত্মিক — সবই সত্যের পরিধির অন্তর্গত।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার অবস্থান হলো, জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা কখনোই সংঘাতে জড়াতে পারে না। যদি কোথাও কোনো দ্বন্দ্ব দৃষ্টিগোচর হয়, তবে তা বাস্তবতার স্বরূপ থেকে নয়; বরং তা নিঃসৃত হয় মানুষের সীমাবদ্ধ ব্যাখ্যা, ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি অথবা আংশিক জ্ঞান থেকে। সত্য এক, কিন্তু এ কথা স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে জ্ঞানের সব পথ অভিন্ন। বাস্তবতা এক বলেই তাকে উপলব্ধির অসংখ্য পথ থাকতে পারে। সেই পথগুলোর পদ্ধতি, ভাষা এবং অনুসন্ধানক্ষেত্র ভিন্ন হলেও যদি তারা সত্যের অনুসন্ধানে অবিচল থাকে, তবে তারা শেষ পর্যন্ত একই মহাবাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন দিক উদ্ঘাটন করবে। প্রতিটি জ্ঞানশাখার নিজস্ব বিষয়বস্তু, অনুসন্ধান-পদ্ধতি ও ব্যাখ্যার পরিসর রয়েছে। প্রাকৃতিক জ্ঞান জগতের ভৌত, জৈবিক ও পরিবেশগত নিয়ম উন্মোচন করে; সামাজিক জ্ঞান মানবসমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে; অভিজ্ঞতালব্ধ মানবিক প্রজ্ঞা জীবনযাপনের ব্যবহারিক কৌশল গড়ে তোলে; আর ওহিগত জ্ঞান অস্তিত্বের চূড়ান্ত উৎস, উদ্দেশ্য ও মানবজীবনের পরিণতি উদ্ভাসিত করে।

এই দর্শন আরও ব্যাখ্যা করে যে, ওহি মানুষের স্বভাবজাত প্রকৃতিকে (ফিতরাত) সজাগ করে, আর সেই জাগ্রত ফিতরাত মানুষকে মহাবিশ্বকে সঠিকভাবে পাঠ করতে সমর্থ করে তোলে। মহাবিশ্বের পর্যবেক্ষণ সামাজিক জীবনে প্রতিফলিত হয় এবং সেই সামাজিক অভিজ্ঞতা নতুন উপলব্ধির জন্ম দেয়। এই সমগ্র চক্রাকার অভিজ্ঞতা পরিণামে মানুষকে ওহির অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা আরও গভীরভাবে অনুধাবন করতে সহায়তা করে। এখানে ওহি বিজ্ঞানকে বাতিল করে না, আবার বিজ্ঞানও ওহির বিকল্প হয়ে ওঠে না। সমাজবিজ্ঞান নৈতিকতার স্থান দখল করে না, নৈতিকতাও সমাজবাস্তবতাকে অস্বীকার করে না। প্রতিটি জ্ঞান অপরটির সম্পূরক হিসেবে একটি সমন্বিত জ্ঞান-ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা স্পষ্ট করছে, জ্ঞানের ঐক্য (ইউনিটি অব নলেজ) আর জ্ঞানের অভিন্নতা (ইউনিফরমিটি অব নলেজ) এক বিষয় নয়। এটি কখনোই দাবি করে না যে সব জ্ঞান একই পদ্ধতিতে অর্জিত হয় বা একই ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেয়। এর দাবি হলো, ভিন্ন পদ্ধতিতে অর্জিত জ্ঞান যদি সত্য হয়, তবে তারা শেষ পর্যন্ত একই বাস্তবতার বিভিন্ন দিক উন্মোচন করবে। ঐক্য এখানে উৎসের, বাস্তবতার এবং উদ্দেশ্যের — পদ্ধতির নয়। যদি কখনো বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যার মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়, তাহলে এই দর্শনের অবস্থান হলো: চূড়ান্ত সত্য কখনো নিজের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করে না। সুতরাং দ্বন্দ্ব দেখা দিলে ধরে নিতে হবে যে, তথ্য, ব্যাখ্যা অথবা পদ্ধতিগত অনুমানের কোথাও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে সত্যের প্রতি আনুগত্যের অর্থ কোনো একটি ব্যাখ্যাকে অন্ধভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া নয়, বরং সংশ্লিষ্ট সব অর্থসম্ভাবনাকে সমালোচনামূলকভাবে পুনর্বিবেচনা করা।

এই জ্ঞানতত্ত্ব ওহিকে জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করলেও, এর ফলে বিজ্ঞান তার স্বাধীনতা হারায় না। বরং ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা বিজ্ঞানকে তার নিজস্ব অনুসন্ধান-পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করে। তবে এই স্বাধীনতা কোনো জ্ঞানশাখাকে সমগ্র বাস্তবতার একচ্ছত্র ব্যাখ্যাকারী হওয়ার অধিকার দেয় না। বিজ্ঞান প্রকৃতির কার্যকারণ ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু নৈতিকতার চূড়ান্ত উৎস বা অস্তিত্বের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নির্ধারণ তার পদ্ধতিগত এখতিয়ারের বাইরে। একইভাবে ওহিও পরীক্ষাগারভিত্তিক অনুসন্ধানের বিকল্প নয়। এই পারস্পরিক সীমারেখা স্পষ্ট করাই জ্ঞানের প্রকৃত সমন্বয়ের পূর্বশর্ত।

এই মডেল জ্ঞানের বহুত্ববাদকেও অস্বীকার করে না; বরং বহুত্বের মধ্যে নিহিত ঐক্যকে ব্যাখ্যা করে। পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, নীতিশাস্ত্র ও তাফসির — প্রতিটির নিজস্ব বিষয়, পদ্ধতি ও ভাষা রয়েছে। কিন্তু তাদের আলোচ্য বাস্তবতা একই মহাবিশ্বের অংশ। তাই তাদের মধ্যে সংলাপ, সমন্বয় এবং পারস্পরিক যৌথতা সম্ভব। এটি বিজ্ঞানের ইসলামায়নধর্মী কোনো সরলীকৃত প্রকল্প নয়, বরং জ্ঞানকে তাওহিদি বিশ্বদৃষ্টিতে পুনর্বিন্যাস করার একটি দার্শনিক প্রয়াস। জ্ঞানের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কেবল তথ্য অর্জন নয়; তার লক্ষ্য হিকমাহ বা প্রজ্ঞার বিকাশ। আর হিকমাহর উদ্দেশ্য কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নয়; বরং ইনসাফ ও আমানতদারির চর্চা — যার পরিধি শুধু মানবসমাজেই সীমাবদ্ধ নয়, সমগ্র প্রকৃতিজুড়ে বিস্তৃত। জীবনে এই সত্যকে জাগ্রত ও বাস্তব রূপে ধারণ করার সাধনাই হলো ফিতরাতভিত্তিক বাস্তুবিদ্যার মূল অন্বেষা।