বাংলাদেশের ধামরাইয়ে প্রতি বছর রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে এক মাসব্যাপী মেলা আয়োজিত হয়। এই মেলায় দেশের নানা প্রান্ত থেকে নাগরদোলা, সার্কাস, পুতুলনাচ, মাটির পুতুল, বাঁশের খেলনা, কুটির শিল্পজাত দ্রব্য ও খাবারের দোকান বসে। বিশাল এই রথটি ছয়তলা বিশিষ্ট এবং এতে যশোমাধব, কানাই, বলাই ও আদ্যাদেবীর মূর্তি স্থাপন করা হয়। ভক্তরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে এই শোভাযাত্রায় অংশ নেন। জানা যায়, গত চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, পুরীর রথযাত্রা সারা বিশ্বে সুপরিচিত। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান এই উৎসবটি আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে শুরু হয়। পুরীর জগন্নাথ মন্দির থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে গুন্ডিচা মন্দির পর্যন্ত এই রথযাত্রা হয়, যা মাসির বাড়ি নামে পরিচিত। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যুর পর তাঁর অর্ধদগ্ধ দেহ কলিঙ্গের সাগর উপকূলে ভেসে আসে। সেখানে শবর আদিবাসীরা সেই দেহকে নীলমাধব নামে পূজা করতে থাকে। পরে অবন্তী নরপতি ইন্দ্রদ্যুম্ন বিষ্ণুর নির্দেশে সে স্থানে মন্দির নির্মাণ করেন। স্বয়ং বিশ্বকর্মা অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় মূর্তি নির্মাণের কাজ ছেড়ে দিলে অসমাপ্ত মূর্তিই পূজিত হতে থাকে। নারদ মুনির পরামর্শে ইন্দ্রদ্যুম্ন সেই অর্ধসমাপ্ত মূর্তির পূজা শুরু করেন এবং পুরীর রথযাত্রার সূচনা করেন।
প্রতি বছর অক্ষয় তৃতীয়ার দিন রথ নির্মাণ শুরু হয়। রথযাত্রার ষোলো দিন আগে স্নানযাত্রার মাধ্যমে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামকে স্নান করানো হয়। এরপর এক পক্ষকাল জগন্নাথ দেবের জ্বরজনিত কারণে তিনি ভক্তদের আড়ালে থাকেন, আর এই সময়ে নতুন মূর্তি তৈরি করা হয়। প্রধান রথগুলোর মধ্যে জগন্নাথের রথ নান্দীঘোষ বা কপিধ্বজ নামে পরিচিত, যার উচ্চতা ৪৫ ফুট ও ১৬টি চাকা রয়েছে। সুভদ্রার রথ পদ্মধ্বজ ও বলরামের রথ তালধ্বজ নামে পরিচিত। পদ্মধ্বজের উচ্চতা ৪৩ ফুট ও ১২ চাকা, আর তালধ্বজের উচ্চতা ৪৪ ফুট ও ১৪ চাকা রয়েছে। নান্দীঘোষে ৮৩২টি, পদ্মধ্বজে ৫৯৩টি ও তালধ্বজে ৭৬৩টি কাঠের টুকরো সংযুক্ত থাকে। রথযাত্রার আগে পুরীর রাজা সোনার ঝাঁটা দিয়ে পথ ঝাঁটিয়ে রথযাত্রার সূচনা করেন। এক সপ্তাহ পর উল্টোরথে তিন ভাইবোন নিজ মন্দিরে ফিরে আসেন এবং রথের কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বাংলার আরেক প্রাচীন রথযাত্রা হল মাহেশের রথ, যার বয়স প্রায় ৬৩০ বছর। কিংবদন্তি অনুসারে, ভক্ত ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী পুরীতে জগন্নাথ দর্শন না পেয়ে উপবাস শুরু করলে দেবতা তাকে গঙ্গার ধারে অপেক্ষা করতে বলেন। পরে গঙ্গায় নিমকাঠ ভেসে এলে তিনি সেই কাঠ দিয়ে মূর্তি তৈরি করেন। এই মন্দিরটি শ্রীরামপুরের মাহেশে অবস্থিত। কথিত আছে, শ্রীচৈতন্য নবদ্বীপ থেকে যাওয়ার পথে এই মন্দির দর্শন করেন এবং এর নামকরণ করেন নব-নীলাচল। পরবর্তী সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণ দেবও মাহেশের রথ দেখতে এসেছিলেন।
সাহিত্যেও রথযাত্রার উল্লেখ রয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাধারানী’ উপন্যাসে মাহেশের রথের মেলায় নায়িকা হারিয়ে যাওয়ার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। পল্লিকবি জসীমউদ্দীন ধামরাই রথের সৌন্দর্য নিয়ে কবিতা লিখেছেন। এই রথযাত্রার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো জাতি-শ্রেণি নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ।



