ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে বিতর্কের মাঝেই পাকিস্তানের জামিয়া দারুল উলুমের দারুল ইফতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া প্রকাশিত হয়েছে। গত ১০ জুন ২০২৬ তারিখে জারি করা এই ফতোয়ায় বিটকয়েন, ইথারিয়াম, ইউএসডিটি-সহ যেকোনো ধরনের ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে লেনদেনকে সম্পূর্ণ নাজায়েজ বা অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফেডারেল শরিয়া আদালতের সাবেক বিচারপতি খ্যাতিমান ইসলামি অর্থনীতিবিদ মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি এই ফতোয়ায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার পুত্র হাসান উসমানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফতোয়াটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ফতোয়াটি জারির পেছনে দুটি ব্যবহারিক প্রশ্ন ছিল—ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে বই কেনা বৈধ কি না এবং অনলাইন শিক্ষামূলক কোর্স কেনা শরিয়তসম্মত কি না। উভয় প্রশ্নের জবাবে ফতোয়া বোর্ড স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে যেকোনো কেনাকাটা বা লেনদেন বৈধ নয়।

ফতোয়ার মূল যুক্তি ইসলামি অর্থনীতিতে ‘মাল’ বা সম্পদের সংজ্ঞার ওপর ভিত্তি করে গঠিত। ইসলামি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থ ইমাম ইবনে আবিদিনের ‘রাদ্দুল মুখতার’ অনুসারে, মাল হলো সেই বস্তু যার প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ থাকে এবং যা প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা যায়। ক্রিপ্টোকারেন্সির কোনো ভৌত অস্তিত্ব নেই এবং এর পেছনে কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকারের আইনি নিশ্চয়তা নেই। ফলে এটি ইসলামি সংজ্ঞায় ‘মাল’ হিসেবে বিবেচিত হয় না। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রাসের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ফতোয়ায় বলা হয়েছে, অস্তিত্বহীন সম্পদের বিনিময়ে লেনদেন করাটাই এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে।

ফতোয়া থেকে দুটি কঠোর ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত এসেছে। প্রথমত, ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে কেনা বই ব্যবহার বা পুনরায় বিক্রি করা সম্পূর্ণ হারাম; বরং সেটি বিক্রেতার কাছে ফেরত দিয়ে প্রচলিত বৈধ মুদ্রায় নতুন চুক্তি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অনলাইন কোর্সের ক্ষেত্রে ক্রেতা প্রকৃত মালিকানা লাভ করেন না বলেই ফাইল ব্যবহার, ডিভাইসে সংরক্ষণ বা উপহার দেওয়া কোনো কিছুই বৈধ নয়। বরং কোর্স ম্যাটেরিয়াল নিজের ডিভাইস থেকে মুছে ফেলা আবশ্যক। এই কঠোরতার পেছনে ইসলামের গারার বা অনিশ্চয়তাপূর্ণ লেনদেনের প্রতি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির চরম মূল্য ওঠানামা ও জবাবদিহির অভাবকে ফতোয়ায় আধুনিক ‘বাইউল গারার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে ইসলামি আইনবিদদের মধ্যে দ্বিমত থাকলেও ফতোয়াটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আলেমের সমর্থন পেয়েছে। তারা যুক্তি দিয়েছেন যে, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাদক, অস্ত্র চোরাচালান ও অর্থ পাচারের ঝুঁকি রয়েছে যা সমাজের জন্য বড় ক্ষতির কারণ। ফিকহের নীতি অনুযায়ী, যা সামগ্রিক কল্যাণের পরিপন্থী তা নিষিদ্ধ করা ওয়াজিব। বাংলাদেশ ব্যাংকও দীর্ঘদিন ধরে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এর মাধ্যমে লেনদেন বা মাইনিং করা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রযুক্তির একটি চমকপ্রদ উদ্ভাবন হলেও ইসলামি অর্থনীতির বাস্তবমুখী ও ইনসাফপূর্ণ কাঠামোর সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে ফতোয়ায় মতামত দেওয়া হয়েছে।