ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, হেদায়েত বা সত্য পথপ্রাপ্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান অনুগ্রহ। তবে কিছু আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দুর্বলতা মানুষকে এই পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় এসব প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সম্প্রতি এক আলোচনায় হেদায়েত লাভে বাধা সৃষ্টিকারী সাতটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, যা নিচে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো।
প্রথমত, হিংসা ও অহংকারকে হেদায়েতের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেছেন, যারা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে অহংকার করে, তাদের তিনি নিজের নিদর্শনসমূহ থেকে দূরে রাখেন। তারা সত্য দেখলেও তা গ্রহণ করে না, বরং ভ্রষ্টতার পথকেই বেছে নেয়। কোরাইশ নেতাদের ক্ষেত্রেও এই হিংসা ও বিদ্বেষই তাদের হেদায়েত থেকে বঞ্চিত করেছিল।
দ্বিতীয় কারণ হলো নেতৃত্ব বা পদমর্যাদার প্রতি লোভ। এই প্রসঙ্গে হিরাক্লিয়াসের উদাহরণ টানা হয়েছে। তিনি নবীজির চিঠি পেয়ে সত্য উপলব্ধি করলেও নিজের পদ ও ক্ষমতা হারানোর ভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেননি। একইভাবে ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ও অহংকারবশত সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল। বর্তমান যুগেও অনেক মানুষ হক জেনেও নেতৃত্বের মোহে তা গ্রহণ করে না।
তৃতীয় বাধা হলো প্রবৃত্তির অনুসরণ। কোরআনে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে, নিজের খেয়াল-খুশির পেছনে ছুটলে তা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেয়। ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এর ব্যাখ্যায় বলেন, প্রবৃত্তিপূজারী ব্যক্তি অন্ধ ও বধির হয়ে যায়, ফলে সে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির প্রতি উদাসীন থাকে।
চতুর্থ ও পঞ্চম প্রতিবন্ধকতা হলো স্বজন ও সম্পদের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা। পরিবার, ধনসম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদির মোহ যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসার চেয়ে বেশি হয়, তবে তা হেদায়েত লাভে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সুরা তাওবার ২৪ নম্বর আয়াতে এ বিষয়ে স্পষ্ট সতর্কবাণী দেওয়া হয়েছে।
ষষ্ঠ কারণ হিসেবে পূর্বপুরুষের অন্ধ অনুসরণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, যখন মুশরিকদের আল্লাহ ও রাসুলের দিকে আসতে বলা হতো, তারা বাপ-দাদার পথই যথেষ্ট বলে দাবি করত। অথচ তাদের পূর্বপুরুষেরা জ্ঞান ও হেদায়েতের অধিকারী ছিল না। আবু তালেবের ঘটনাও এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য; তিনি মৃত্যুশয্যায় রাসুলের দাওয়াত গ্রহণ করেননি, বরং আবদুল মুত্তালিবের ধর্মেই অটল থাকেন।
সপ্তম ও শেষ কারণ হলো শয়তানের অনুসরণ। শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য আল্লাহর কাছে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং সে তার অনুসারীদের জাহান্নামের দিকে আহ্বান করে। কোরআনে শয়তানকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তার পদাঙ্ক অনুসরণ করলে কেউ কখনো হেদায়েত পাবে না বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, আল্লাহর নির্দেশনা ও নবী-রাসুলদের পথ অনুসরণ করলেই কেবল হেদায়েত লাভ সম্ভব। এর বিপরীত পথে গেলে মানুষ চিরকালের জন্য সত্য থেকে বঞ্চিত হবে।



