হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রকাশিত ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি।

প্রথমেই নারী ও শিশু নির্যাতনের তথ্য উল্লেখযোগ্য। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪০৪ জন ধর্ষণ এবং ৮৮ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার। ধর্ষণের পর ১৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে ১ হাজার ৭৭ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২০০টি পৃথক ঘটনায় ৩৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির সম্মুখীন হয়েছেন। এদের মধ্যে আহত হয়েছেন ২৩৪ জন, ৬০ জন লাঞ্ছিত, ৪৯ জন হুমকির শিকার এবং ১১ জনকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আওতায় ১৫টি মামলায় ৩৩ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।

সীমান্ত এলাকায় ঘটনার কথাও জানিয়েছে এইচআরএসএস। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৩২টি ঘটনায় বিএসএফের হামলায় ৯ জন নিহত ও ৩৫ জন আহত হয়েছেন। এছাড়াও ৩৮ জনকে আটক এবং ১৭৩ জনকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশ ইন করা হয়েছে। অপরদিকে, মিয়ানমার সীমান্তে ২০টি ঘটনায় একজন নিহত, পাঁচজন আহত এবং আরাকান আর্মির পেতে রাখা স্থলমাইনের বিস্ফোরণে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও কথিত বন্দুকযুদ্ধে ছয় মাসে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে কারাগারে ৫৮ জন বন্দী মারা গেছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ৪০টি সভা-সমাবেশে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে, যাতে ৩১১ জন আহত এবং ৩৮ জন আটক হয়েছেন।

রাজনৈতিক মামলা ও গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছে, ছয় মাসে বিভিন্ন আইনে ১৪৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় ৩ হাজার ২৬৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ২৪ হাজার ৫১৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। অন্তত ৩ হাজার ৬৭ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন।

নির্বাচনী সহিংসতার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৩৯৬টি ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ২ হাজার ৫৭৮ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে ৬০০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় ২৬১টি ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত ও ২৫৬ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চুরি, ডাকাতি, ধর্মীয় অবমাননা, আধিপত্য বিস্তার ইত্যাদি কারণে এসব ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদনের কেন্দ্রীয় তথ্য হলো রাজনৈতিক সহিংসতা। জানুয়ারি-জুন সময়ে ৮৩০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ২৪৬ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৩৭ জন, জামায়াতের ৬ জন, আওয়ামী লীগের ৩ জন, অন্যান্য দলের ৮ জন, একজন চরমপন্থী সদস্য ও একজন সাধারণ নারী রয়েছেন। সহিংসতার ৮১ শতাংশই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য দলের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ঘটেছে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫০টি ঘটনায় ৫৬ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ১৯টি মন্দির, ১৫টি প্রতিমা এবং ৪৩টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। জমি দখলের চারটি ঘটনার পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এক নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

প্রতিবেদনের শেষ অংশে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালীকরণ এবং রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।