ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে বুধবার বিকেলে 'গণ-অভ্যুত্থানের বাঁক বদলের দিন' শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ক্ষমতাসীন বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এই সভার আয়োজন করে। সভায় জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দ এবং শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভাগ্য যাতে আইনানুগ পদ্ধতিতে নির্ধারিত হয় সে বিষয়ে সরকার সচেষ্ট। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ফ্যাসিবাদী মাফিয়া সংগঠন হিসেবে বর্তমানে যার কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেই দলের বিষয়ে প্রশাসনিক আদেশে রাজনীতি নিষিদ্ধ করাকে তারা সমর্থন করেন না। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের উদাহরণ টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেভাবে হিটলারের নাৎসি বাহিনী ও গেস্টাপোকে নিষিদ্ধ করে রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, ঠিক তেমনি বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহার করে শিশু ও গৃহিণী হত্যাসহ নজিরবিহীন গণহত্যার দায় থেকে আওয়ামী লীগ রেহাই পাবে না।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) অ্যাক্ট এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়েছে। ফলে ব্যক্তি শেখ হাসিনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগকে সংগঠন হিসেবেও বিচারের মুখোমুখি করা যাবে। সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে সংগঠনের বিচারের স্পষ্ট বিধান রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
শেখ হাসিনার বিচার প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তার আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই। প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আনুষ্ঠানিক পত্র ইতিমধ্যে পাঠানো হয়েছে। ফিরিয়ে এনেই গ্রেপ্তার ও আদালতের রায় কার্যকর করা হবে। এছাড়া বিদেশে পলাতক সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এরই মধ্যে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানান তিনি।
জুলাই বিপ্লবের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'তুমি কে আমি কে/ রাজাকার রাজাকার', 'কে বলেছে কে বলেছে/ স্বৈরাচার স্বৈরাচার' স্লোগানে ইতিহাসের গতিপথ বদলে যায়। তিনি নির্বাসনে থাকলেও এই আন্দোলনের প্রতি তার পূর্ণ মনোযোগ ও সহযোগিতা ছিল বলে উল্লেখ করেন। সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, স্বাধীনতা অর্জন সহজ হলেও তা রক্ষা করা কঠিন। স্বৈরাচারী শক্তি যাতে আর গণতন্ত্রকে পদদলিত করতে না পারে, সে জন্য রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে ৩১ দফার আলোকে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।
তিনি জানান, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে জাতীয় জুলাই সনদ স্বাক্ষর করেছে। সেই সনদ অনুযায়ী সংবিধান ও আইনকানুনের সংস্কার সাধন করা হবে। জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই বিপ্লবের কৃতিত্ব কারও একার নয়, সাধারণ মানুষ বুক পেতে দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। স্বৈরাচারের পরিণতি সম্পর্কে ভবিষ্যৎ সরকারগুলো যেন শিক্ষা নিতে পারে, সে জন্য গণভবনকে 'জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে' রূপান্তরিত করা হচ্ছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সভায় সভাপতিত্ব করেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। স্বাগত বক্তব্য দেন ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন এবং সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন। গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে সভার সমাপ্তি ঘটে।


