আমাদের সাধারণ ধারণায় রিজিক বলতে কেবল দৃশ্যমান বস্তুগত প্রাচুর্যকেই বোঝায়। কিন্তু বাস্তবে রিজিকের একটি গভীর ও প্রসারিত অদৃশ্য জগত রয়েছে, যার প্রকৃত মূল্য আমরা প্রায়শই উপলব্ধি করতে পারি না। রিজিক মূলত বহুমাত্রিক। এর এক রূপ হলো বৈষয়িক, যার মধ্যে পড়ে অর্থ, ভূমি, বাহন, সামাজিক অবস্থান কিংবা উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা। অন্য রূপটি পুরোপুরি আধ্যাত্মিক, যেমন প্রজ্ঞা, মানসিক প্রশান্তি, অন্তরের তুষ্টি ও সঠিক বোধশক্তি। কিছু রিজিক আবার উভয় ধরনের বৈশিষ্ট্যের মিশেল, শারীরিক সুস্থতা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
তবে এ সবকিছুর উর্ধ্বে অবস্থান করছে এক পরম ও শ্রেষ্ঠ রিজিক, আর তা হলো ইমান বা বিশুদ্ধ বিশ্বাস, এবং সেইসাথে একটি জীবন্ত, অনুভূতিশীল ও কোমল হৃদয়। বাহ্যিক ধন-সম্পদ হারিয়ে ফেলার যে ক্ষতি, তার থেকেও ভয়াবহ হলো নিজের হৃদয়ের সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলা। গুনাহের কাজ ও অমনোযোগিতা অন্তরের ভেতরে একটি গাঢ় অন্ধকার সৃষ্টি করে। বিপরীতভাবে, সৎকর্ম অন্তরে খোদায়ি আলোর সঞ্চার করে। মহানবী (সা.) এই বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, মানুষ তার নিজের কৃত পাপের দরুণই তার রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪০২২) অন্তরের এই জ্যোতি ও চেতনা কোনো স্থির বিষয় নয়; বান্দার আমলের ওপর ভিত্তি করে তার অনুভবের জোয়ার-ভাটা চলে।
যেভাবে দুনিয়ার বিত্ত-বৈভবের মাঝে মানুষের ভাগ্যের তফাৎ পরিলক্ষিত হয়, ঠিক তেমনি করে মানুষের হৃদয়ের অনুভব ও করুণার গভীরতায়ও রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “আমিই তাদের মধ্যে তাদের দুনিয়াবি জীবনের জীবিকা বণ্টন করি এবং একজনকে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করি।” (সুরা যুখরুফ, আয়াত: ৩২) পাবিবারিক ধন-সম্পদের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান একটি রিজিক হলো অনুভুতি প্রবণ একটি অন্তর। কারও কষ্ট দেখলে বুকের ভেতরের মনটা যে কেঁদে ওঠে, তা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অনন্য উপহার। আল্লাহর বাণী শ্রবণ করলে যে হৃদয় ভয় ও অনুতাপে প্রকম্পিত হয়—এমন দান কি সবাই লাভ করে? প্রকৃত মুমিনদের পরিচয় দিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, “প্রকৃত মুমিন তো তারাই, যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে যখন আল্লাহর জিকির করা হয়।” (সুরা আনফাল, আয়াত: ২) অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, “অতঃপর তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহর জিকিরে নরম হয়ে যায়।” (সুরা জুমার, আয়াত: ২৩)
একটি সতকাজ শেষ করার পর মনে যে খাঁটি আনন্দের সৃষ্টি হয়, অথবা কোনো ভুল করে ফেললে অন্তরে যে অপরাধবোধের অনুভব জাগে, তা আসলে একটি জিবন্ত হৃদয়েরই স্পষ্ট লক্ষণ। এটি এক বিশাল আধ্যাত্মিক স ম্পদ। অন্যদিকে, কঠিন ও নিষ্ঠুর অন্তর হলো রিজিক থেকে বঞ্চিত হবার আলামত। একটা প্রচলিত কথা আছে, সুস্বাস্থ্য হলো এক মুকুটের মতো, যার মূল্য একমাত্র অসুস্থ ব্যক্তিরাই গভীরভাবে বোঝে। অনুরুপভাবে, অন্তরের কোমলতার মর্ম তারাই উপলব্ধি করতে পারে, যাদের হৃদয় শুকিয়ে পাথর হয়ে গিয়েছে। কোরআন এই আত্মিক অন্ধত্বের কথা উল্লেখ করে জিজ্ঞাসা করে, “তবে কি তারা কোরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না, নাকি তাদের হৃদয়ের ওপরে তালা লেগে আছে?” (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ২৪) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এক ব্যক্তি তার নাতিদের আদর করতে দেখে বিস্মিত হয়ে বলেছিল, “আমার দশটি সন্তান আছে, কিন্তু আমি কখনই তাদের কোনোজনকে চুমু দিইনি!” তখন নবীজি (সা.) দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, “আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া-মায়াই ছিনিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে আমার কিছু করার নেই। যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।” (সহি বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৭)
যার হৃদয় পাষাণের মতো কঠিন হয়ে যায়, সে আসলে এই পরম রিজিক থেকে বঞ্চিত। কোরআনে এমন মানুষদের তিরস্কার করে বলা হয়েছে, “তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৭৯) মানুষ যখন তার ব্যক্তিগত খাহেশ ও কুপ্রবৃত্তিকেই নিজের একমাত্র উপাস্য হিসেবে বরণ করে নেয়, তখন তার অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয় (সুরা জাসিয়াহ, আয়াত: ২৩)। এর সরাসরি ফলাফল হচ্ছে, সেই হৃদয় পাথরের চাইতেও কঠিন হয়ে ওঠে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ৭৪)
রিজিকের ধারণা শুধু নিজের ভেতরকার অনুভূতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; অন্যের মনে জায়গা করে নেওয়া এবং মানুষভালোবাসা অর্জন করাও এক মহান দান। আল্লাহ্ তায়ালা তার প্রিয় বান্দাদের হৃদয়কে অদৃশ্য এক ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে দেন। ইবাদম হয়েছে, “তিনি তাদের অন্তরের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন। পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ ব্যয় করেও তুমি তাদের মধ্যে এই প্রীতি স্থাপন করতে পারতে না, কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন।” (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬৩) আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি, সমাজের কিছু মানুষ অতি সামান্য প্রচেষ্টাতেই সবার ভালোবাসা পেয়ে যান; তাদের কথাবার্তা ও আচরণ অবলীলায় অপরের অন্তর স্পর্শ করে। পক্ষান্তরে, অনেকের বিস্তর জ্ঞান, বুদ্ধি বা সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তারা মানুষের সত্যিকারের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত থাকেন। মূলত এটি হলো ‘হৃদয় জয়ের রিজিক’। যখন কথা শুধু মৌখিক উচ্চারণ হয়, তখন তা শ্রোতার কান পর্যন্ত পৌঁছেই থামে; কিন্তু যখন কথা অনুভূতির অতল গভীরতা থেকে উৎসারিত হয়, তখন তা সরাসরি গিয়ে অন্যের বুকে আঘাত হানে।
মানুষ যখন নিজের হৃদয়কে আল্লাহর সাথে গভীরভাবে যুক্ত করে ফেলে, তখন জগতের কোনোকিছুতে তাকে আর ছোট করতে পারে না। সুফি সাধক ইবনে আতাউল্লাহ আল-ইসকান্দারির ভাষায়, “হে আল্লাহ, যে তোমাকে হারিয়েছে সে আর কী পেল? আর যে তোমাকে পেয়েছে সে আর কী হারাল?” (আল-হিকাম আল-আতাইয়্যাহ) পাষাণ হৃদয় কখনও সমাজে ভালোবাসার ধারা সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়। নির্দয় হূদয় কখানো সমাজে ভালোবাসার ঝরনাধারা তৈরি করতে পারে না। কথা যখন শুধু মুখ থেকে বের হয়, তা মানুষের কান পর্যন্ত গিয়েই থেমে যায়; কিন্তু কথা যখন অনুভূতির গভীর থেকে বের হয়, তা সোজা অন্য মানুষের অন্তরে গিয়ে আঘাত করে।
পরিশেষে বলা যায়, বাহ্যিক রিজিকের পেছনে ছোটার আগে আমাদের বুঝতে হবে, আভ্যন্তরীণ ও আধ্যাত্মিক রিজিকের মূল্য কত বেশি। একটি জীবন্ত, আল্লাহভীরু ও করুণার্দ্র হৃদয়ই প্রকৃতপক্ষে মহান সৃষ্টার পক্ষ থেকে দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার।




