মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সংসার ছিল মানবিক অনুভূতি, ভালোবাসা ও সহনশীলতার এক জীবন্ত উদাহরণ। কোরআনে তাঁর চরিত্রকে ‘মহান চরিত্র’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে (সুরা কলাম, আয়াত: ৪)। তাঁর ঘর কোনো আবেগহীন বা যান্ত্রিক স্থান ছিল না; বরং তা ছিল গভীর স্নেহ ও ক্ষমার মধুর সম্মিলন।

একবার স্ত্রী আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে সামান্য মতপার্থক্য দেখা দিলে নবীজি সহাস্যে সমাধানের উদ্যোগ নেন। তিনি আয়েশাকে জিজ্ঞেস করেন, “এই বিষয়টি মীমাংসার জন্য তুমি কাকে বিচারক হিসেবে পছন্দ করো? ওমরকে কি মেনে নেবে?” আয়েশা ওমরের কঠোর ব্যক্তিত্বের কথা স্মরণ করে বলেন, “না, ওমর অত্যন্ত কঠোর, আমি তাকে চাই না।” নবীজি তখন তাঁর পিতা আবু বকর (রা.)-কে ডাকার প্রস্তাব দেন, যা আয়েশা মেনে নেন। আবু বকর আসলে নবীজি আয়েশাকে বলেন, “তুমি কি আগে কথা বলবে, নাকি আমি বলব?” আয়েশা অভিমানের সুরে বলেন, “আপনিই বলুন, তবে সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলবেন না।” মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে আবু বকর ব্যথিত হয়ে বলেন, “ওরে নিজের শত্রু, আল্লাহর রাসুল কি সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলেন?”—এই বলে তিনি শাসনের উদ্দেশ্যে মেয়ের নাকে আঘাত করেন। আয়েশা দ্রুত নবীজির পিঠের পেছনে আশ্রয় নেন। নবীজি আবু বকরকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “আমরা তো আপনাকে এই কাজের জন্য ডেকে আনিনি এবং আপনার কাছ থেকে এমন আচরণও আমরা আশা করিনি। আমি আপনাকে কসম দিয়ে বলছি, আপনি এখন চলে যান।” (তাবারানি, আল-মু’জামুল আওসাত, হাদিস: ৫৬৩৩) আবু বকর চলে যাওয়ার পর নবীজি আয়েশাকে কাছে ডেকে বলেন, “দেখলে তো, লোকটার হাত থেকে তোমাকে কীভাবে বাঁচিয়ে দিলাম।” পরে আবু বকর আবার ঘরে আসার অনুমতি চাইলে দেখেন নবীজি ও আয়েশা মান-অভিমান ভুলে হাসিখুশি মেজাজে কথা বলছেন। তিনি বলেন, “আপনাদের যুদ্ধের দিনে যেমন আমাকে মাঝখানে রেখেছিলে, আজ এই শান্তির ক্ষণেও কি আমাকে একটু শামিল করবেন?” নবীজি মুচকি হেসে বলেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, শামিল করলাম, তোমাকে শামিল করলাম।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৯৯)

স্ত্রীদের মনখারাপ দূর করতে নবীজির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনন্য। একবার স্ত্রী সাফিয়াকে (রা.) কাঁদতে দেখে তিনি কারণ জিজ্ঞাসা করেন। সাফিয়া জানান যে, আরেক স্ত্রী হাফসা (রা.) তাঁকে নিয়ে মন্তব্য করে বলেন যে তিনি একজন ইহুদির কন্যা। সাফিয়া ছিলেন বনু কোরাইজা গোত্রের প্রধানের কন্যা, যিনি ইসলাম গ্রহণ করে নবীজির স্ত্রী হন। এই কথায় তাঁর আত্মসম্মানে আঘাত লেগেছিল। নবীজি বিচক্ষণতা ও ভালোবাসার সঙ্গে বলেন, “তুমি তো একজন নবীর (হারুন আলাইহিস সালাম) বংশধর, তোমার চাচাও একজন নবী (মুসা আলাইহিস সালাম) এবং তুমি একজন নবীর (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রী! তবে সে কিসের ভিত্তিতে তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে?” এই কয়েকটি কথায় তিনি সাফিয়ার বংশগত গৌরব ও সম্মান ফিরিয়ে দেন এবং তাঁর হৃদয়ের ব্যথা দূর করেন। পরে তিনি হাফসাকে ডেকে বলেন, “হাফসা, আল্লাহকে ভয় করো।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৪)

পারিবারিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে ইফকের ঘটনায়, যখন আয়েশার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটানো হয়। পুরো মদিনা সমাজ তোলপাড় হলেও নবীজি সংযম ও শিষ্টাচারের চরম পরাকাষ্ঠা দেখান। আয়েশা অসুস্থ থাকায় প্রথমে এই অপবাদের কথা জানতেন না, তবে তিনি লক্ষ্য করেন নবীজির স্নেহ কিছুটা কমে গেছে। নবীজি ঘরে ঢুকে শুধু জিজ্ঞেস করতেন, “মেয়েটি কেমন আছে?” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭৫০) চরম মানসিক কষ্টের মধ্যেও তিনি আয়েশার প্রতি কোমলতা হারাননি। তিনি আয়েশাকে ডেকে বলেন, “যদি তুমি নির্দোষ হও, তবে আল্লাহ অবশ্যই তোমাকে নিষ্পাপ প্রমাণ করবেন।” পরে কোরআনের আয়াত নাজিল করে আল্লাহ আয়েশার পবিত্রতা ঘোষণা করেন। (সুরা নুর, আয়াত: ১১)

এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, দাম্পত্য জীবনে মান-অভিমান ও ক্ষমার মধুর রসায়ন গড়ে তুলতে নবীজির জীবনপদ্ধতি অনুসরণীয়।