ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার মৌলিক ভিত্তি হলো 'মারাতিবুল ইলম' বা জ্ঞানের স্তরবিন্যাসের দর্শন। এই মতবাদ অনুযায়ী, জ্ঞানের ঐক্য থাকলেও সব জ্ঞান কখনোই একই মর্যাদা পেতে পারে না। বাস্তবতার বিভিন্ন স্তর, যেমন দৃশ্যমান ও অদৃশ্য, ভৌত ও নৈতিক, এবং সাময়িক ও চিরন্তন, জ্ঞানের স্তরবিন্যাসকেও অনিবার্য করে তোলে। এই স্তরবিন্যাস ক্ষমতার জন্য নয়, বরং এটি নির্ধারিত হয় জ্ঞানের বিষয়, তার পরিধি ও ব্যাখ্যাগত গভীরতার ভিত্তিতে।
এই ক্রমপর্যায়ের সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করে ওহিগত জ্ঞান। এর মর্যাদার মূল কারণ হলো এর আলোচ্য বিষয়। ওহি সেই সব প্রশ্নের সদুত্তর প্রদান করে যেগুলো অন্য কোনো জ্ঞানের শাখার পদ্ধতিগত পরিধির মধ্যে পড়ে না। যেমন, অস্তিত্ব কেন, মানুষের উদ্দেশ্য কী, নৈতিকতার শেষ ভিত্তি কোথায়, মৃত্যুর পরে কী ঘটে, এবং আমানত ও খেলাফতের প্রকৃত মর্ম কি—এসবের জবাব একমাত্র ওহির কাছেই পাওয়া সম্ভব। ফলে ওহি প্রকৃতি পাঠের এক প্রান্তিক দিশা-নির্দেশক হিসেবে কাজ করে, যা কারণ বিশ্লেষণ না করে মূল উদ্দেশ্য উন্মোচন করে।
পরবর্তী স্তরে রয়েছে ফিতরাতগত জ্ঞান, যা মানুষের অন্তর্নিহিত একটি স্বীকৃতিশক্তি। এর মাধ্যমে মানুষ ন্যায়-অন্যায়, সৌন্দর্য-অসুন্দর এবং সাম্য-বিশৃঙ্খলার প্রাথমিক উপলব্ধি অর্জন করে। এই জ্ঞান পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ বা অবিশ্বস্ত কোনোটিই নয়। এটি ওহির আলোয় পরিশুদ্ধ হয় এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পরিপক্কতা পায়। ফিতরাতকে মানুষের হৃদয়ের একটি দাঁড়িপাল্লার সাথে তুলনা করা যায়, যা নফস বা কুপ্রবৃত্তি, খারাপ অভ্যাস ও সংস্কৃতির ধূলায় আচ্ছন্ন হতে পারে। তাই একে জাগ্রত রাখতে ওহি ও তাজকিয়াহ (আত্মার পরিশুদ্ধি) আবশ্যক।
এরপর আসে পর্যবেক্ষণনির্ভর বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের পালা, যা প্রকাশ করে সৃষ্টিজগত কীভাবে পরিচালিত হয়, তার কারণ-কার্যক্রম, বিন্যাস, পরিবর্তন ও বিভিন্ন নিয়ম। এই জ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ সৃষ্টির রক্ষণাবেক্ষণের (খেলাফত) দায়িত্ব পালনে এর প্রক্রিয়া বোঝা জরুরি। যদিও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান প্রক্রিয়া ব্যাখ্যায় সিদ্ধহস্ত, তবু সৃষ্টির উদ্দেশ্য নির্ধারণের অধিকার এদের নেই। জ্ঞানের স্তরবিন্যাস এই সীমারেখাটি সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে দেয়।
এর পাশাপাশি রয়েছে ঐতিহাসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জ্ঞান, যা সম্মিলিত মানবজীবন, অভিজ্ঞতা, প্রতিষ্ঠান ও সভ্যতার পরিবর্তনশীল সত্তা ব্যাখ্যা করে। এসব জ্ঞানের সত্যতা আপেক্ষিক অর্থে নয়, বরং প্রাসঙ্গিকতার দিক থেকে বিকাশমান এবং এগুলো সংশোধনযোগ্য ও ক্রমবিবর্তনশীল। কিন্তু এদের মূল্য মোটেই কম নয়; কারণ বাস্তব সমাজে ওহিভিত্তিক আদর্শের প্রয়োগও এগুলো ছাড়া অসম্ভব।
সর্বশেষ স্তরটি হলো কারিগরি ও প্রয়োগগত জ্ঞানের। যেমন কৃষি পদ্ধতি, চিকিৎসা, প্রকৌশল, শাসন ব্যবস্থা ও প্রযুক্তি। এগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার অপরিহার্য উপকরণ, তবে কখনোই এগুলো নৈতিক বা অস্তিত্বমূলক সত্যের বদলে ব্যবহার করা যায় না। অত্যন্ত উন্নত কোনো প্রযুক্তিও এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে না যে তা মানবজাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনছে কি না।
জ্ঞানের এই স্তরভেদের লক্ষ্য কোনো জ্ঞানকে ছোট বা বড় করা নয়, বরং প্রতিটি জ্ঞানকে তার উপযুক্ত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করা। বিশৃঙ্খলার সূচনা তখনই হয় যখন কোনো এক স্তর নিজেকে পুরো জ্ঞানের একচ্ছত্র নিয়ন্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালায়। যেমন বিজ্ঞান যখন দর্শনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, দর্শন ওহির আসন কেড়ে নিতে চায়, অথবা প্রচলিত অভিজ্ঞতা পরীক্ষিত জ্ঞানের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই বিশৃঙ্খলাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং জ্ঞানের শিষ্টাচারের (আদব) ওপর জোর দেয়, যার প্রাথমিক শর্ত হলো প্রতিটি জ্ঞানকে তার নিজস্ব স্তরেই প্রতিষ্ঠা করা। ফলত, জ্ঞানের যথার্থ সমন্বয় তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন প্রতিটি শাখা নিজস্ব মর্যাদা স্বীকার করে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা (তাআউন) ও পূর্ণতা (তাকামুল) সাধনের সম্পর্কে আবদ্ধ হয়।




