সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা সদরে মরিচ্চাপ নদীর বিধ্বংসী ভাঙনের মুখে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন ও জীবিকা। জেলা শহর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই এলাকার চাপড়া সেতু ও আশাশুনি বাজারের সংলগ্ন তীরবর্তী এলাকাগুলোতে ভাঙনের ভয়াবহ রূপ দেখা যাচ্ছে। অনেক বসতবাড়ির অংশ ইতিমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে, আবার অনেক বাড়ির দেয়ালে দেখা দিয়েছে গভীর ফাটল। নদীর পাড়ের মাটি ধসে খাড়া হয়ে যাওয়ায় ঘরবাড়ি ও দোকানপাট এখন চরম ঝুঁকির মুখে। স্থানীয়রা বাঁশ এবং বালুর বস্তা দিয়ে নিজেদের সম্পদ রক্ষার চেষ্টা করলেও তা যথেষ্ট হচ্ছে না।

নদীর পাড়ে বসবাসকারী মিনারা বেগমের করুণ অভিজ্ঞতা এই সংকটের বহিঃপ্রকাশ। প্রায় ১০ বছর আগে স্বামী আরিফুল ইসলাম সরদার অনেক কষ্টে ইটের বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন, যা তখন নদী থেকে ২০ হাতেরও বেশি দূরে ছিল। তবে গত এক বছরে নদীভাঙনের ফলে তাঁর বাড়ির তিনটি ঘর নদীতে তলিয়ে গেছে। মিনারা জানান, নদী খননের পর সংগৃহীত মাটি বাড়ির পাশে দেওয়া হলেও বৃষ্টি ও জোয়ারের তোড়ে তা পুনরায় নদীতে চলে গেছে। এখন তাঁর আট সদস্যের পরিবারটি সম্পূর্ণ গৃহহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।

স্থানীয়দের মতে, প্রায় দুই বছর আগে নদী খননের প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি ছিল। শামীম সরদার এবং ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আবদুল হাইয়ের দাবি, খননের সময় নদীর পাড়ের গোড়ার মাটি কেটে ওপরে দেওয়া হয়েছিল এবং কৃত্রিমভাবে স্রোতের গতিপথ বদলে আশাশুনি বাজারের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে জোয়ারের পানি এসে পাড়ের গোড়া ফাঁকা করে দিচ্ছে এবং দ্রুত ভাঙন ত্বরান্বিত করছে। আবদুল হাই জানান, দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বাজারে চায়ের দোকান চালালেও আগে নদী এত কাছে ছিল না, কিন্তু এখন জোয়ারের পানি তাঁর ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং পুরো ঘরটি নদীতে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। প্রশাসনের লোকজন পরিদর্শন করলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

মানিকখালী এলাকার বাসিন্দা নাজমা বেগমের অবস্থা আরও শোচনীয়। নদীভাঙনে তাঁদের চলাচলের পথটি ইতিমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দেওয়া কিছু টিন দিয়ে ঘর মেরামত করলেও এখন সেই ঘরটিও নদীগর্ভে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে। তাঁর মতে, মজবুত বাঁধ নির্মাণ ছাড়া এখানে বসবাস করা অসম্ভব।

এই সংকট সমাধানে সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মুহাদ্দিস রবিউল বাশার সম্প্রতি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তিনি ওই এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ এবং স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।

আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্যামানন্দ কুণ্ডু স্বীকার করেছেন যে, নদীভাঙন উপজেলার অন্যতম প্রধান সমস্যা। মরিচ্চাপ নদী ছাড়াও বুধহাটা, কাকবাসিয়া, কুড়িকাহনিয়া ও তেয়ারডাঙায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। তবে বরাদ্দের স্বল্পতার কারণে আশাশুনি বাজার এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার কাজ সীমিত আকারে চলছে। অন্যদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী আবদুল আলিম জানান, নকশা অনুযায়ী নদী পুনঃখনন করা হলেও বর্তমানে বৃষ্টির কারণে জিও ব্যাগ প্লেসিংয়ের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে ২০০ মিটার এলাকায় কাজ ধরা হলেও পুরো সমস্যা সমাধানে অন্তত ৬০০ মিটার এলাকায় কাজ করা প্রয়োজন। তবে চূড়ান্ত বরাদ্দ না পাওয়ায় ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ করানো কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।