বাংলাদেশের কৃষি জমিতে আগাছা দমনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক প্যারাকোয়াট এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ১০টি হাসপাতালের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে করা এক সাম্প্রতিক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১০ থেকে ২০ মিলিলিটার প্যারাকোয়াট পানে ফুসফুস ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যায় এবং রোগী কয়েক সপ্তাহ ধরে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর মুখে পড়েন। তীব্র কিডনি বৈকল্য, ঘন ঘন বমি ও পেটে ব্যথা এর প্রধান উপসর্গ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে সারা দেশে প্যারাকোয়াট পানে বিষক্রিয়ার মাত্র একটি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল, যেখানে মৃত্যু হয়েছিল একজনের। কিন্তু ২০২৪ সালে এসে এই রাসায়নিক পানে বিষক্রিয়ার ৪৯৩টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গত ১২ বছরের হিসাব বলছে, এ সময়ে মোট ১ হাজার ৪২০টি প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা ঘটেছে। গবেষকেরা এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের জন্য একটি ‘বিষবৈজ্ঞানিক সংকট’ বলে বর্ণনা করেছেন।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্যারাকোয়াট পানে আক্রান্তদের বড় অংশই তরুণ। আক্রান্তদের ৭৮ দশমিক ২ শতাংশের বয়স ১২ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। পেশাগত দিক থেকে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন শিক্ষার্থী (৩৮ দশমিক ১ শতাংশ) ও গৃহিণী (২৪ দশমিক ৫ শতাংশ), যেখানে কৃষকদের হার ১৪ শতাংশ। ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে গত জুলাই মাসে বিষক্রিয়া নিয়ে ১১৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছিলেন, যাদের বেশিরভাগই আগাছানাশক পান করেছিলেন। এই জেলায় আত্মহত্যার প্রবণতা দীর্ঘদিনের।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে প্যারাকোয়াটের আমদানি ও ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০১৩ সালে যেখানে ৫৩ টনের বেশি প্যারাকোয়াট আমদানি হয়েছিল, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬৯৫ টনে। কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্রামে দিনমজুরের সংকট ও পারিশ্রমিক বৃদ্ধির কারণে কৃষকেরা সহজলভ্য এই রাসায়নিকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। অথচ জনস্বাস্থ্যের ওপর এর মারাত্মক প্রভাবের কারণে বিশ্বের ৭৭টির বেশি দেশে এটি নিষিদ্ধ। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার না করলেও তেলেঙ্গানাসহ একাধিক রাজ্য সরকার এর ব্যবহার বন্ধ করেছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্যারাকোয়াটের সংস্পর্শে এলে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক গবেষণায় এই রাসায়নিকের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের যোগসূত্রও পাওয়া যাচ্ছে। প্যারাকোয়াটের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক না থাকায় মৃত্যুর হার এত বেশি বলে জানিয়েছেন গবেষণার প্রধান লেখক বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরী। তিনি বলেন, পাকস্থলী পরিষ্কার, স্টেরয়েড, হেমোডায়ালাইসিসের মতো বর্তমান চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।
প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করলে আত্মহত্যার হার উল্লেখযোগ্য হারে কমতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। বিএমসি পাবলিক হেলথ জার্নালে ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০০৬ সালে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধের পর মাত্র চার বছরের মধ্যে কীটনাশক পানে আত্মহত্যার হার প্রতি লাখে ৫ দশমিক ২৬ থেকে কমে ২ দশমিক ৬৭-এ নেমে আসে, যা প্রায় অর্ধেক। বাংলাদেশ ২০০০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ক্লাস-১’ ভুক্ত অত্যন্ত বিপজ্জনক কীটনাশক নিষিদ্ধ করেছিল, যা আত্মহত্যার হার কমাতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক গোপাল দাশের নেতৃত্বে করা আরেকটি গবেষণায় দেশে নিবন্ধিত ৩৪৩টি সক্রিয় কীটনাশক উপাদান বিশ্লেষণ করে ২৫টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি কীটনাশক, ৭টি ছত্রাকনাশক, ৫টি আগাছানাশক ও ২টি ইঁদুরনাশক রয়েছে। অধ্যাপক গোপাল দাশ বলেন, এই ২৫টির মধ্যে প্রথমেই প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করা উচিত। একসময় শুধু চা-বাগানের আগাছা দমনের জন্য ব্যবহৃত হলেও এখন সমতলের কৃষি থেকে শুরু করে দুর্গম পাহাড়ের জুমখেতেও প্যারাকোয়াটের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, শুধু প্যারাকোয়াট নয়, এ ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিকের ক্ষতির মাত্রা নিরূপণের জন্য পেশাজীবী ও গবেষকদের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী দেড় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিবেদনে সত্যিই খুব ক্ষতিকর প্রমাণ পাওয়া গেলে নিষিদ্ধের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তবে বিষক্রিয়া নিয়ে গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া চিকিৎসক ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরীসহ বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কৃষক ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্যারাকোয়াটের বিকল্প নেই, বরং এটির ব্যবহার বন্ধ করাই এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রমিজ উদ্দিন জানান, ইন্টিগ্রেটেড উইড ম্যানেজমেন্ট ও যান্ত্রিক আগাছা দমনের পাশাপাশি ইমাজাপাইর, কারফেনট্রাজোন-ইথাইলের মতো তুলনামূলক কম ক্ষতিকর আগাছানাশক ব্যবহারের বিকল্প রয়েছে।




