রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার আতানারায়ণপুর গ্রামের এক পরিবারে গত ছয় বছরে ক্যানসারে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এই রোগে বর্তমানে আক্রান্ত হয়ে লড়ছেন পরিবারের আরও দুজন সদস্য। ছোট্ট ইসরাত জাহান ও তার পাঁচ বছর বয়সী ভাই জুনায়েদ ইসলামের ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, এসারুল ইসলামেরা পাঁচ ভাই ছিলেন। ২০১৯ সালে মেজ ভাই সাদরুল ইসলাম লিভার ক্যানসারে মারা যান, বয়স হয়েছিল প্রায় ৪৬ বছর। এরপর ২০২২ সালে বাবা আবদুল হামিদ ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর শরীরেও লিভার ক্যানসার ধরা পড়েছিল। ২০২৪ সালে প্রায় ৪০ বছর বয়সে সেজ ভাই মামুন অর রশিদও লিভার ক্যানসারে মারা যান। সবশেষ এক বছর দুই মাস আগে এসারুল ইসলাম মারা যান, তাঁর বয়স হয়েছিল ৪০ বছর।

মোহনপুর মহিলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক শিক্ষক এসারুল ইসলামের মৃত্যুর এক মাস পর তাঁর স্ত্রী মোসা. ঝরনার ব্রেন ক্যানসার ধরা পড়ে, যা ইতিমধ্যে চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এছাড়া ২০২২ সালে ইসরাতের বড় চাচা ও স্থানীয় হাইস্কুলের শিক্ষক শফিকুল ইসলামের কোলন ক্যানসার শনাক্ত হয়। তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং তিনি এখনো চিকিৎসাধীন।

বাবার চিকিৎসার জন্য চারবার ভারতে গিয়েছিল ইসরাত। সেখানে হাসপাতালে বসে সে ছবি আঁকত, যেখানে ফুটে উঠত বাংলাদেশের প্রকৃতি ও স্মৃতিসৌধ। সেই ছবিগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। এসারুলের চিকিৎসার জন্য সোনালী ব্যাংক থেকে আট লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে পাঁচ লাখ টাকা এখনো পরিবারের ওপর বকেয়া রয়েছে।

ঝরনার চিকিৎসা চলছে নিয়মিত কেমোথেরাপির মাধ্যমে। সম্প্রতি স্ট্রোকের কারণে তাঁর ডান হাত ও পা অবশ হয়ে গেছে। ব্রেনে অস্ত্রোপচারও করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কিছু ঠিকমতো মনে রাখতে পারেন না এবং কথা বলতে গেলে আটকে যান। এসারুলের মা জীবিত থাকলেও তিনি মেয়ের বাড়িতে থাকেন, ফলে অসুস্থ ঝরনার দেখাশোনা করার মতো কেউ ঘরে নেই।

ঝরনা জানান, সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ৫০ হাজার টাকা পেলেও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়ায় সেই টাকা তোলা যাচ্ছে না। সংসার চালাতে গত বৃহস্পতিবার মুঠোফোন বিক্রি করে তিন মাসের বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেছেন তিনি।

গ্রামের ঐতিহ্যবাহী বড় এই পরিবারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল মাটির দোতলা বাড়ির দরজা বন্ধ, উঠানে জমেছে শেওলা। ছোট্ট জুনায়েদ রান্না করতে পারে, আর ইসরাত সব সময় চুপচাপ থাকে। ইসরাতের পড়াশোনার প্রতি ভীষণ আগ্রহ, মাসখানেক আগে সে পড়াশোনার জন্য ঢাকায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। মোহনপুর বাস টার্মিনালে এক কন্ডাক্টর তাকে আটকে তার মাকে খবর দিলে সে ফিরে আসে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে দৈনিক গড়ে ৪৫৮ জন নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হয় এবং বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬ জন। প্রতিদিন গড়ে ৩১৯ জন ক্যানসারে মারা যান, বছরে যা ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯৮ জন। সংস্থাটি বলছে, প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য একটি করে ক্যানসার সেন্টার প্রয়োজন। বাংলাদেশে ১৭০টি ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র থাকা দরকার, কিন্তু বর্তমানে আছে মাত্র ২২টি, যার সিংহভাগ রাজধানীতে।

মোহনপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইমাম হোসেন শামীম জানান, পরিবারটির জন্য ৫০ হাজার টাকার অনুদান ও রোগী কল্যাণ ফাউন্ডেশন থেকে কিছু ওষুধ দেওয়া হয়েছে। ঝরনা যেকোনো সময় মারা যেতে পারেন বলে শিশু দুটিকে রাখার জন্য রাজশাহীর এসওএস শিশু পল্লীর সঙ্গে কথা বলে রাখা হয়েছে। এসারুলের ভাই আনোয়ার হোসেন, যিনি হেপাটাইটিস বি পজিটিভ, তিনি ক্যানসার আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারের বিশেষ পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।