রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের একটি চর এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। গত দশ থেকে পনেরো দিনের মধ্যে এই পরিচিতি বদলে দিয়েছে চরটির চেহারা। যেখানে একসময় বহিরাগত মানুষের আনাগোনা ছিল খুবই সীমিত, সেখানে এখন প্রতিদিন প্রায় এক হাজার থেকে বারোশো দর্শনার্থী পদ্মার এই চরে ঘুরতে আসছেন। ভিডিও ও ছবির মাধ্যমে ছড়ানো সৌন্দর্যই এই ভিড়ের মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে।
স্থানটির স্থানীয় নাম মিডিল চর। রাজশাহী নগরের সাতবাড়িয়া ডগার ঘাট থেকে নৌকায় প্রায় দশ থেকে বারো মিনিটের পথ পেরোলে চোখে পড়ে বিস্তৃত সবুজ মাঠ, চরে বেড়ানো গবাদিপশু এবং দূরের ছোট ছোট ঘরবাড়ি। পদ্মার পানি ও নরম বিকেলের আলো মিলে চরটির পরিবেশকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তোলে। এই দৃশ্যই এখন ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর প্রধান আকর্ষণ।
দর্শনার্থীরা এখানে এসে শুধু প্রকৃতি উপভোগ করেন না, বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলা ও ছবি তোলায়ও সময় কাটান। নগরের বাসিন্দা মুবাশ্বিরের মতে, পুরো এলাকা বেশ ফাঁকা থাকায় খেলাধুলার সুযোগও মেলে। ঘাট থেকে চরে যাতায়াতের জন্য নৌকায় জনপ্রতি পঞ্চাশ টাকা ভাড়া লাগে, যা কম খরচে ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে রাজশাহী ও আশপাশের এলাকা থেকে তরুণদের দল বেঁধে আসার প্রবণতা বেড়েছে।
মানুষের এই ঢলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নৌকার ব্যস্ততাও। আগে যেখানে দুই-তিনটি নৌকা চলাচল করত, সেখানে এখন দশ থেকে পনেরোটি নৌকা যাওয়া-আসা করছে। ঘাটে বর্তমানে বারোটি নিবন্ধিত নৌকা রয়েছে। ডগার ঘাটের ইজারাদার মো. শাফিউল্লাহ জানান, উড়ন্ত ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের পর দর্শনার্থীর সংখ্যা হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়েছে। নৌকার মালিকদের আয় বাড়লেও ভাড়া বাড়ানো হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। চরের বাসিন্দা মো. আজাদ আলীর ভাষ্যেও একই চিত্র ফুটে ওঠে।
তবে সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নতুন কিছু সমস্যাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। চরের মাঠজুড়ে এখন প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও অন্যান্য আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। মানুষের ভিড় বাড়ায় অস্থায়ী দোকানপাট গড়ে উঠেছে, যেখানে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা পিয়ারুলের মতে, দর্শনার্থীরা যদি নির্দিষ্ট পাত্রে ময়লা ফেলেন, তবে চরটির সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব। এ বিষয়ে ডাস্টবিন বসানোর জন্য সিটি করপোরেশনকে জানানো হয়েছে বলেও ঘাটের ইজারাদার জানান।
চরটি কেবল মানুষের বিনোদনের স্থান নয়, এটি দেশীয় ও পরিযায়ী পাখিদেরও বিচরণস্থল। হঠাৎ মানুষের এমন ভিড় পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। গরু ও ছাগলের চারণভূমিতে দর্শনার্থীরা ঢুকে পড়ছেন, কেউ পশুদের সঙ্গে ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও ধারণ করছেন। এতে গবাদিপশুর চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, দর্শনার্থী বাড়ার কারণে গরু-বাছুরের চলাচলেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলায় পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে।
মিডিল চরে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় সাতশো থেকে আটশো। তাঁদের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ ও গবাদিপশু পালন। স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, চরে গরু ও ছাগলের সংখ্যা আট হাজার থেকে সাড়ে আট হাজার। গম, মসুর, খেসারি, ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়। পাটের আবাদ শেষ হওয়ায় বর্তমানে অনেকেই পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত। এখানকার মানুষের জীবনযাপনও দর্শনার্থীদের কাছে নতুন এক অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরা দিয়েছে।
চরের বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, তাঁর পূর্বের বসতি খিদিরপুর নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। আগে এই চরে বহিরাগত মানুষের দেখা মিলত না, কিন্তু এখন প্রতিদিন নতুন মুখ আসছেন। তবে তাঁর প্রত্যাশা, এই ভিড় যেন চরটির স্বাভাবিক জীবন ও পরিবেশকে নষ্ট না করে।
নৌযাত্রার নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন গুরুত্ব পাচ্ছে। পদ্মার স্রোত বাড়লে ঝুঁকি বাড়ে। তাই রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের নির্দেশনায় নৌকার মাঝিদের মধ্যে লাইফ জ্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার নগরের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের মালেক ডগার ঘাটে মাঝিদের হাতে এসব জ্যাকেট তুলে দেওয়া হয়। রাসিক সচিব সোহেল রানার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এই কার্যক্রমে অংশ নেয়। এ সময় নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী না তোলা ও যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার জন্য মাঝিদের সচেতন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন রাসিকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল আলমসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।




