বাংলাদেশের দাবা অঙ্গনে গ্র্যান্ডমাস্টার (জিএম) খেতাবধারীর সংখ্যা একই রয়ে গেছে প্রায় দুই দশক ধরে। ২০০৮ সালে এনামুল হোসেন রাজীবের পর থেকে আর কোনো নতুন গ্র্যান্ডমাস্টার তৈরি হয়নি। এই সময়ে প্রতিবেশী ভারতে গ্র্যান্ডমাস্টারের সংখ্যা ১৮ থেকে বেড়ে ৮৯-এ পৌঁছেছে। বাংলাদেশের দীর্ঘ এই খরা কাটানোর দায়িত্ব নিয়েছেন ফাহাদ রহমান, মনন রেজা এবং প্রয়াত গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানের ছেলে তাহসিন তাজওয়ার। বর্তমানে ফাহাদ রহমান সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তার মাত্র একটি জিএম নর্মের প্রয়োজন। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ভিয়েতনামের হ্যানয় থেকে প্রথম নর্ম এবং গত মে মাসে ইস্তাম্বুলে দুই টুর্নামেন্টের দ্বিতীয়টিতে ৯ ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় নর্ম অর্জন করেন ফাহাদ। তবে ২৯ জুলাই কাজাখস্তানের ওসকেমেন শহরের টুর্নামেন্টে মাত্র এক পয়েন্টের জন্য তৃতীয় নর্ম হাতছাড়া হয়েছে তার। ফাহাদের নিজের ভাষ্যমতে, কাজাখস্তানে আরেকটু ভালো পারফরম্যান্স করলে নর্মটি অর্জিত হতো, কিন্তু শেষ মুহূর্তের মানসিক চাপ তাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। প্রথম টুর্নামেন্টে হাঙ্গেরির একজন গ্র্যান্ডমাস্টারের কাছে হেরে বসায় নর্ম পাওয়ার সুযোগ নষ্ট হয় তার, শেষ পর্যন্ত ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানারআপ হন তিনি। গত জুনে মঙ্গোলিয়ায় অসুস্থতার কারণে শেষ রাউন্ড খেলতে না পেরেও তিনি নর্ম হারিয়েছেন। এখন তার রেটিং ২৪৫৪ থেকে কমে ২৪৪৩-এ নেমে এসেছে। আগামী ১৫ আগস্ট আবুধাবি মাস্টার্স, সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়ায় মাস্টার্স টুর্নামেন্ট এবং উজবেকিস্তানে বিশ্ব দাবা অলিম্পিয়াডে তৃতীয় নর্ম অর্জনের চেষ্টা করবেন তিনি। অন্যদিকে, ১৬ বছর বয়সী মনন রেজা বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক মাস্টার (আইএম) হয়েছেন ২০২৪ সালের অক্টোবরে। আইএম হওয়ার পর এখন পর্যন্ত পাঁচটি জিএম নর্মের টুর্নামেন্টে খেলেছেন তিনি। গত এপ্রিলে এসএসসি পরীক্ষার কারণে চার-পাঁচ মাস খেলা থেকে দূরে থাকায় কিছুটা ছন্দ হারান তিনি। ২ জুলাই হাঙ্গেরিতে দুই মাসের সফরে টানা পাঁচটি টুর্নামেন্ট খেলতে যান মনন। চতুর্থ টুর্নামেন্টের শেষ রাউন্ডে জিতলে তার প্রথম নর্ম আসত, কিন্তু স্লোভাকিয়ার একজন গ্র্যান্ডমাস্টারের কাছে হেরে যান তিনি এবং চ্যাম্পিয়নের পরিবর্তে রানারআপ হন। তৃতীয় টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হলেও নর্ম হাতছাড়া হয় আধা পয়েন্টের জন্য। বর্তমানে হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট থেকে পঞ্চম টুর্নামেন্টটি খেলছেন তিনি, যেখানে তিন রাউন্ড শেষে তার সংগ্রহ মাত্র আধা পয়েন্ট। তবে মনন আশাবাদী, তিনি খেলতে খেলতেই একদিন গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে যাবেন। প্রয়াত গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানের ছেলে তাহসিন তাজওয়ার বর্তমানে আইএম খেতাব অর্জনের চেষ্টা করছেন। তার আইএম হতে ২৪০০ রেটিং প্রয়োজন, কিন্তু বর্তমানে তার রেটিং ২৩০০-এর নিচে নেমে গেছে। বাবাকে হারানোর শোক এবং 'এ লেভেল' পরীক্ষার কারণে ছয় মাসের বিরতি কাটিয়ে টানা সাতটি টুর্নামেন্ট খেলতে মাকে নিয়ে সার্বিয়া সফরে গেছেন তিনি। দ্বিতীয় টুর্নামেন্টে যুগ্মভাবে রানারআপ হয়ে ৫০০ ইউরো পুরস্কার পেলেও, পঞ্চম টুর্নামেন্টে ৩৮ রেটিং পয়েন্ট বাড়িয়েছেন তিনি। তবে শুরুর টুর্নামেন্টগুলোতে খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে রেটিংয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে। ২৩৫১ রেটিং নিয়ে সার্বিয়া যাওয়া তাহসিনের রেটিং সপ্তম টুর্নামেন্টের সময় ২২৮৫-এ নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সার্বিয়ার পোজারেভাৎস শহরের চলমান ষষ্ঠ টুর্নামেন্টে পাঁচ ম্যাচে সাড়ে তিন পয়েন্ট নিয়ে তিনি দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। তিনি আশা করছেন, সামনে অলিম্পিয়াডসহ অন্যান্য টুর্নামেন্টে ভালো খেলে এ বছরই আইএম খেতাব অর্জন করবেন। বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদ বলেছেন, দুটি জিএম নর্ম নিয়ে ফাহাদ এগিয়ে থাকলেও মনন রেজার মেধা ও টেম্পারামেন্ট আরও বেশি আশাব্যঞ্জক। তার মতে, দ্রুতই এই দুই তরুণ জিএম হয়ে যাবেন। ফাহাদকে ইউরোপের টুর্নামেন্টগুলোতে নিয়মিত খেলানোর পরিকল্পনা রয়েছে ফেডারেশনের। মননের জন্য দেশে জিএম নর্ম টুর্নামেন্টের সংখ্যা বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করছেন নিয়াজ। তাহসিনের পথ কঠিন হলেও, তাকেও আরও বেশি খেলার সুযোগ দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। আর্থিক সহায়তার বিষয়ে নিয়াজ জানান, ফাহাদ, তাহসিন ও সাকলাইন তিতাস গ্যাস থেকে আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন। বর্তমান কমিটির সভাপতি এবং সহসভাপতিরাও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। অলিম্পিয়াড থেকে ফিরেই এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তবে তাহসিনের মা তাসমিন সুলতানা আক্ষেপ করে জানান, কোনো স্পনসর ছাড়া এই বড় সফর চালানো তাদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, পড়াশোনা এবং শেষ রাউন্ডের স্নায়ুচাপ এই তিন তরুণের প্রধান বাধা। এই অদৃশ্য প্রতিপক্ষকে হারাতে পারলেই ১৮ বছরের দীর্ঘ খরা কাটানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
১৮ বছর পর নতুন গ্র্যান্ডমাস্টারের অপেক্ষায় বাংলাদেশ, দীর্ঘ খরা কাটাতে লড়ছেন তিন তরুণ
২০০৮ সালে এনামুল হোসেন রাজীবের পর বাংলাদেশে আর কোনো নতুন গ্র্যান্ডমাস্টার তৈরি হয়নি। ফাহাদ রহমান, মনন রেজা ও তাহসিন তাজওয়ার নামের তিন তরুণ এই দীর্ঘ খরা কাটানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তের মানসিক চাপ ও আর্থিক সংকট তাদের পথ কঠিন করে তুলেছে।


