বর্তমান দলবদলের বাজারে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সম্ভাব্য ক্লাব পরিবর্তন। ব্রাজিলের এই তারকা ফরোয়ার্ড ইংলিশ ক্লাব আর্সেনালে যোগ দিতে পারেন বলে জোর গুঞ্জন উঠেছে। রিয়াল মাদ্রিদের অনুশীলনে ফিরলেও তাঁর চুক্তি এখনো নবায়ন হয়নি। ক্রীড়াবিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিক জানিয়েছে, কেন এই জটিলতা তৈরি হয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণ।

২০১৮ সালে ফ্ল্যামেঙ্গো থেকে প্রায় সাড়ে চার কোটি ইউরোর বিনিময়ে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে পা রাখেন ভিনিসিয়ুস। তখন তিনি ছিলেন শুধুই একজন উঠতি প্রতিভা। ২০২২ সালে প্রথমবার চুক্তি নবায়নের সময়ই ইঙ্গিত মেলে ভবিষ্যতে দলবদল নিয়ে সমস্যা হতে পারে। ক্লাব তাঁকে তিনটি বিকল্প দিয়েছিল—২০২৭, ২০২৮ বা ২০২৯ সাল পর্যন্ত চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর। রিয়ালের সতীর্থ এদেরসন মিলিতাও ও রদ্রিগো ২০২৮ সাল পর্যন্ত চুক্তি করলেও ভিনিসিয়ুস স্বল্প মেয়াদের পথ বেছে নেন, অর্থাৎ ২০২৭ সাল পর্যন্ত। ২০২১-২২ মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে লিভারপুলের বিপক্ষে নায়ক হওয়া ভিনিসিয়ুস তখন নিশ্চিত ছিলেন, নিজেকে বিশ্বসেরাদের কাতারে নিয়ে যাওয়ার পথে দ্রুতই আরও ভালো শর্তে চুক্তি নবায়ন করতে পারবেন।

সংবাদ সম্মেলনে রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা তার আত্মবিশ্বাসের প্রমাণ রেখেছেন। ২০২৪ সালে ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতাসহ নানা বোনাস মিলিয়ে ভিনিসিয়ুসের বার্ষিক করমুক্ত আয় এখন প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ইউরো। তবে সমস্যা তৈরি হয়েছে ‘নবায়ন বোনাস’ নিয়ে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রিয়াল মাদ্রিদের জেনারেল ম্যানেজার হোসে আনহেল সানচেজ ও প্রধান স্কাউট হুনি কালাফাতের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন ভিনিসিয়ুস। ক্লাবের প্রস্তাব ছিল বছরে করমুক্ত ২ কোটি ইউরো, যা ভিনিসিয়ুস ও তাঁর প্রতিনিধিরা প্রত্যাখ্যান করেন। দ্য অ্যাথলেটিকের তথ্য অনুযায়ী, ভিনিসিয়ুসের দাবি প্রায় ৩ কোটি ইউরোর কাছাকাছি একটি প্যাকেজ, যেখানে মূল বেতন ও পারফরম্যান্স বোনাসের পাশাপাশি রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে অভূতপূর্ব এক ‘নবায়ন বোনাস’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বেতনসীমার কারণে ক্লাব মূল বেতন খুব বেশি বাড়াতে রাজি না হওয়ায় আয় বাড়ানোর একমাত্র পথ এই নবায়ন বোনাস বলে মনে করছেন ভিনিসিয়ুসের ঘনিষ্টজনরা। এখানে তুলনা আসে সতীর্থ কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে। এমবাপ্পের বেতন প্রায় একই রকম হলেও পিএসজি থেকে ফ্রি এজেন্ট হিসেবে যোগ দেওয়ার সময় তিনি মোটা অঙ্কের ‘সাইনিং বোনাস’ পেয়েছিলেন। রিয়াল মাদ্রিদ শুরু থেকেই ভিনির এই দাবির বিরোধী। ক্লাবের আশঙ্কা, একবার এই নজির তৈরি হলে ভবিষ্যতে অন্য খেলোয়াড়দের চুক্তি নবায়নের সময়ও একই দাবি উঠবে। তবে ভিনিসিয়ুস ও তাঁর প্রতিনিধিরা সমঝোতার সুযোগ রেখেছেন, দাবি কিছুটা কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

এই টানাপোড়েনের সুযোগ দারুণভাবে কাজে লাগাতে চায় আর্সেনাল। মাদ্রিদ ও ভিনিসিয়ুসের মধ্যকার দূরত্ব বুঝে কয়েক মাস ধরে পর্দার আড়ালে কাজ করে যাচ্ছে লন্ডনের ক্লাবটি। আর্সেনালের স্পোর্টিং ডিরেক্টর আন্দ্রেয়া বার্তা সরাসরি কথা বলেছেন ভিনিসিয়ুসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে। লন্ডন থেকে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়েছে, আর্সেনালে এলে তিনি হবেন এমন এক দলের মধ্যমণি, যারা গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ জিতেছে এবং চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে খেলেছে, যেখানে পিএসজির কাছে টাইব্রেকারে হেরেছিল তারা।

এদিকে, লাইপজিগ থেকে ইয়ান দিয়োমান্দেকে দলে ভেড়ানোর রিয়ালের পরিকল্পনা ঘিরেও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। আর্সেনাল-ঘনিষ্ঠরা মনে করছেন, ভিনিসিয়ুস চলে গেলে বিকল্প প্রস্তুত রাখছে রিয়াল। তবে দিয়োমান্দের দলবদল এখনো চূড়ান্ত নয়, ফলে সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

ভিনিসিয়ুসের সামনে এখন তিনটি রাস্তা খোলা—রিয়ালের সঙ্গেই চুক্তি নবায়ন করা, আগামী গ্রীষ্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করে ফ্রি এজেন্ট হিসেবে ক্লাব ছাড়া অথবা এখনই আর্সেনালে পাড়ি জমানো। রিয়ালের জন্য ঝুঁকিটা স্পষ্ট: চুক্তি শেষ হয়ে গেলে দলবদল ফি ছাড়াই হারাতে হবে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ডকে। আবার সামনের মৌসুমেই তাঁকে দিতে হবে বড় অঙ্কের লয়্যালটি বোনাসও। সব মিলিয়ে আর্সেনাল আশা করছে, চুক্তির শেষ সময়ের এই অনিশ্চয়তা কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক কম দামে ভিনিসিয়ুসকে দলে টানার বড় সুযোগ তৈরি হবে। এখন দেখার বিষয়, ভিনিসিয়ুস কোন পথ বেছে নেন।