একজন সহপাঠীর সঙ্গে একত্রে ভ্রমণের পরিকল্পনা ছিল, দুইজনই টাকা জমা দিয়েছিলেন। শর্ত ছিল, একজন না গেলে অন্যজনও যাবে না। কিন্তু যাওয়ার দিনে সে ফোন করে জানাল, কোনো কারণে যেতে পারবে না। তাই সেই গ্রুপ ভ্রমণে আর যোগ দেওয়া হলো না। পরদিন সকালে ফেসবুকে দেখলাম, সেই সহপাঠী অন্য দলের সঙ্গে ভ্রমণে গিয়েছে। মেসেজে কারণ জানতে চাইলে সে বলল, মত পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু সময় না থাকায় জানানো সম্ভব হয়নি। এরপর থেকে সেই সহপাঠীর সঙ্গে আর কোনো ভ্রমণ বা অন্য পরিকল্পনা করিনি।

শিক্ষকতা পেশায় থাকা এক বন্ধুকে একাডেমিক বইয়ের জন্য কয়েকবার অনুরোধ করেছিলাম। দিন, সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে যখন বছর শেষ হলো, তখন আর বইয়ের কথা বলিনি, সেও ভুলে গেল। পরে অন্য একজন অল্প পরিচিত ব্যক্তির সাহায্যে বই সংগ্রহ করি। দীর্ঘদিনের এক বন্ধুকে প্রতি শুক্রবার ফোন করতাম। কারণ, বড় চাকরির কারণে সপ্তাহের একমাত্র ছুটির দিন ছিল সেটি। টানা বেশ কয়েক শুক্রবার ফোন করেও দেখা করা হলো না। একদিন ফোন ধরলে জানাল, পরিবারের একজন সদস্যকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটছে। সেদিনই সন্ধ্যায় বাইরে বেরিয়ে দেখলাম, সে অন্য বন্ধুদের সঙ্গে পিজা খেতে বসে আছে। রাস্তা পাল্টে চলে গেলাম। অথচ একসময় সে বেকার থাকাকালীন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার সঙ্গে কাটাত, নিজের হতাশার কথা বলত, আর আমি সান্ত্বনা দিতাম।

রাজশাহীতে কর্মরত এক বন্ধু বলেছিল, "তুমি রাজশাহী এলে আমি জানব না, এমনটা কখনো হবে না।" কিন্তু মাস কয়েক পর রাজশাহী গিয়ে দেখা করলাম না, কোনো যোগাযোগও হলো না। কারণ, তখন আমার সঙ্গে তার সামাজিক ও আর্থিক অবস্থানের আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বন্ধুত্বের সম্পর্কও হালকা হয়ে গিয়েছিল। কলেজ জীবনের এক বন্ধু বলেছিল, "বিয়ে হলে তুই সব দায়িত্ব নিবি।" সময় পেরিয়ে সে ক্যারিয়ারে প্রতিষ্ঠিত হলো, মাঝেমধ্যে মেসেঞ্জারে হাই হ্যালো হতো। একদিন তার টাইমলাইনে নতুন বিয়ের ছবি দেখে জানলাম, সে বিয়ে করেছে, আমাকে নিমন্ত্রণ করা হয়নি।

ডিপার্টমেন্টের এক জুনিয়র প্রতি বছর ইয়ার ফাইনাল শেষে আমার বইগুলো নিয়ে যেত, কারণ তার আর্থিক সমস্যা ছিল। কোনো অর্থ নিতাম না। একসময় সে অনার্স শেষ করল, আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলো। কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষার পর থেকে সে আর ফোন করে না, রাস্তায় দেখা হলে না চেনার ভান করে চলে যায়। আমি শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম।

এই ঘটনাগুলোর কোনোটি কারও জীবনে একবার, কোনোটি দুইবার, কোনোটি সবগুলোর মতো ঘটে। কিন্তু একেবারেই ঘটে না, এমন মানুষ বিরল। আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা এমন যে, মানুষের অর্থ ও সামাজিক অবস্থানের ওপর সম্পর্কগুলো টিকে থাকে। আর্থিক বৈষম্যের কারণে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বেও ফাটল ধরে। প্রিয়জন বা পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও অবস্থান না মিললে সম্পর্ক তেমন গুরুত্ব পায় না। অনেকেই বলেন, মনে থাকে না, ভুলে গেছি, কিন্তু কাজের সময় দেখা যায় তারা দূরত্ব বজায় রেখেছে। আসলে অনেকে সত্যিই ভুলে যায়, আবার অনেকে মনে রাখলেও গুরুত্ব দেয় না, ইচ্ছা করে সাহায্য করে না।

বিপরীতে থাকা মানুষের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান দেখেই তাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করেন সবাই। আবেগকে যতই গুরুত্ব দেওয়া হোক, দিন শেষে বাস্তবতাই মুখ্য। অর্থ-সম্পদ, নাম-যশ-খ্যাতি, প্রতিষ্ঠিত জীবনে মিশে গিয়ে অনেকেই অতীত ভুলে যায়, সম্পর্ক ছিন্ন করে, আচরণ বদলে ফেলে। কথাগুলো শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্য। এটাই সমাজের নিয়ম, কেউ এর বাইরে নয়।

তবুও এমন মানুষ আছেন, যারা সম্পর্কের মর্যাদা দিতে জানেন। নিজের বা অন্যের অবস্থান যাই হোক, অতীতের স্মৃতি হয়ে যাওয়া মানুষদের মনে রাখেন, সম্মান করেন, শ্রদ্ধা করেন, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে যোগাযোগ করেন। বর্তমান পরিস্থিতি যা-ই হোক, অতীতকে মনে রেখে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। এমন মানুষের কারণেই পৃথিবী এখনো সুন্দর আছে, শত বৈষম্যের মধ্যেও মানুষের বসবাস উপযোগী পরিবেশ রয়েছে।