আগামী ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে সরকার, যেখানে দেশের মানুষের গড় আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) 'ট্রান্সফর্মিং ইকোনমি ফ্রম ফ্রেজাইলিটি টু প্রসপারিটি' শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে মাথাপিছু আয় ৪ হাজার ৫৯১ ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের গড় মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৯৫৮ ডলার। গত বুধবার এই প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
মাথাপিছু আয় বলতে কোনো ব্যক্তির একক আয় বোঝানো হয় না, বরং দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত আয়ের সাথে প্রবাসী আয় যোগ করে মোট জাতীয় আয়কে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হয়। সরকার আগামী পাঁচ বছরে মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা করছে। ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে, যদিও গত জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩২ শতাংশ। একইসাথে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়ে চলতি অর্থবছরে নির্ধারিত ৬.৫ শতাংশ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে ৮.৫ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।
অর্থনৈতিক রূপান্তরের এই যাত্রাকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছে জিইডি। প্রথম বছরকে 'পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতার বছর' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে বিনিময় হার স্থিতিশীল করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের অবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হবে। প্রথম থেকে তৃতীয় বছর পর্যন্ত সময়কে 'পুনঃস্থাপনের বছর' বলা হয়েছে, এই পর্যায়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, কার্যকর সরকারি ব্যয় নিশ্চিত করা এবং চাপে থাকা ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম বছরকে 'পুনর্গঠন ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর বছর' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিকে 'টেক-অফ' করানো হবে। ব্যাংক, রাজস্ব, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন খাতের বিস্তারিত সংস্কার পরিকল্পনা এই প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পনাটিতে উন্নয়নের স্পৃহা থাকলেও বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনার অভাব রয়েছে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ মতামত দিয়েছেন যে, এটি সরকারের ভবিষ্যৎ ভাবনার প্রতিফলন এবং এতে মোটাদাগে কিছু দিকনির্দেশনা আছে। তবে কর্মসংস্থান, কর, ব্যাংক ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মতো খাতে সময়সীমা নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, তৈরি পোশাকনির্ভর রপ্তানি, বিনিয়োগ মন্দা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির কারণে অর্থনীতির চালিকা শক্তি কম, তাই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল জরুরি।
ব্যাংক খাতের সংস্কারে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। দেশের ব্যাংকগুলোতে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিকল্পনার প্রথম বছরে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, পরবর্তী দুই বছরে ব্যাংক পুনর্গঠন এবং শেষ দুই বছরে গভীর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রথম ধাপে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক, খেলাপি ঋণ ও আমানতকারীদের সুরক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেবে। দ্বিতীয় ধাপে ব্যাংকের সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ আদায়ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে। সর্বশেষ ধাপে ব্যাংকগুলোর দক্ষতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনা হবে।
রাজস্ব খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে রাজস্ব নীতি ও আদায় বিভাগকে আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুরু হয়েছে। এছাড়াও একক ভ্যাট হার প্রবর্তন, করছাড় কমানো, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ন্যূনতম কর নির্ধারণ এবং ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে কর প্রদান সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যদিও বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে কম কর-জিডিপি অনুপাতের দেশগুলোর মধ্যে একটি।
যোগাযোগ খাতকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-লাকসাম-ফেনী কর্ডলাইন (রেলপথ), ঢাকা-চট্টগ্রাম ডাবল লাইনে বিদ্যুতায়ন, ঢাকা-পঞ্চগড় ডাবল লাইন এবং ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ ডাবল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়াও ঢাকা থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত রেল সংযোগ স্থাপন এবং রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর জন্য মেট্রোরেল, এলিভেটেড রেল ও মনোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব কমাতে সরকার নানা উদ্যোগের পরিকল্পনা করেছে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ৫৬০ জন তরুণকে স্টার্টআপ ফান্ড থেকে অর্থ প্রদান এবং ১ হাজার ২০০ নারী উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির অপরিহার্য পূর্বশর্ত হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদাহিতা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্যকর সুশাসন কাঠামো একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে কার্যকর রাজস্ব ও মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন, নিম্ন মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় থাকবে।




