নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে তথ্য কমিশন দীর্ঘ ২২ মাস ধরে কার্যত স্থবির থাকায়। কমিশনে বর্তমানে সাড়ে সাতশর বেশি অভিযোগ নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। অচল এই কমিশনের কারণে অভিযোগের শুনানি তো বটেই, তথ্য অধিকারবিষয়ক প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

গত বছরের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমিতে সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার আবদুল মালেক ও তথ্য কমিশনার শহীদুল আলম ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মাসুদা ভাট্টিকেও অপসারণ করা হয়েছিল। পদত্যাগ ও অপসারণের পর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার কমিশন পুনর্গঠনে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হয় কমিশন গঠনের কাজ সম্পন্ন না করেই।

বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ মাস পর এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছে। গত ৯ জুলাই প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনার নিয়োগের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। আপিল বিভাগের বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের সভাপতিত্বে এই কমিটিতে আছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান ও মাসুদ সাঈদী এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ। বাছাই কমিটি প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুজন করে প্রার্থীর নাম রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপন করবে। তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে কমিশন গঠনের কাজ সম্পন্ন করা হবে।

এদিকে তথ্য কমিশনে নিয়মিত সচিবের পদও শূন্য রয়েছে। বর্তমানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শাহ আলম অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন। সম্প্রতি আগারগাঁওয়ের তথ্য কমিশন ভবন ঘুরে দেখা গেছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা থাকলেও কার্যক্রমে তেমন গতি নেই। এক কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, কমিশনের মূল কাজ—অভিযোগের শুনানি, প্রশিক্ষণ ও প্রচার—সবই বন্ধ। আইন অনুযায়ী প্রতিবছর ৩১ মার্চের মধ্যে বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রতিবেদন তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরও জানান, জমা থাকা ৭৮০ অভিযোগ পুরো চিত্র নয়, কারণ কমিশন অচল থাকায় অনেকেই অভিযোগ করছেন না।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের ভাষ্য, তথ্য কমিশনের মতো জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও দুদকও দীর্ঘদিন ধরে গঠিত হচ্ছে না। তবে তথ্য কমিশনের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। তার মতে, জনগণের কাছে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাবেই অন্তর্বর্তী সরকার কমিশন গঠনে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার রয়েছে, ফলে এখন একটা স্বাধীন ও শক্তিশালী তথ্য কমিশন গঠনের প্রত্যাশা করা যায়।