সমুদ্রের বুকে নিস্তরঙ্গভাবে ভেসে থাকা ডলফিনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তার একটি চোখ বন্ধ, অন্যটি খোলা। মানুষসহ বেশিরভাগ প্রাণী ঘুমালে দুই চোখই বন্ধ থাকে এবং মস্তিষ্কের দুই অংশ একসঙ্গে বিশ্রামে যায়। তবে ডলফিনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন; তাদের মস্তিষ্কের এক অর্ধেক ঘুমিয়ে পড়লেও বাকি অর্ধেক সজাগ থাকে। জেগে থাকা মস্তিষ্কের বিপরীত পাশের চোখটি খোলা থাকে—ডান মস্তিষ্ক জাগ্রত থাকলে বাঁ চোখ খোলা থাকে এবং এর বিপরীতটিও সত্য। এই অস্বাভাবিক ঘুমের প্রক্রিয়াকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বলা হয় ইউনিহেমিস্ফেরিক স্লো-ওয়েভ স্লিপ (USWS)।
১৯৬৪ সালে গবেষক জন সি লিলি প্রথম এই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি ধারণা করেছিলেন, ঘুমের মধ্যেও ডলফিন তার চারপাশ দেখতে ও শুনতে সক্ষম। এর পরবর্তী সময়ে রুশ জীববিজ্ঞানী লেভ মুখামেতভ এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন। ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফি বা ইইজি পরীক্ষায় দেখা যায়, ডলফিনের মস্তিষ্কের দুই গোলার্ধে আলাদা আলাদা তরঙ্গ কাজ করে—একটিতে ধীর গতির ঘুমের ছাপ থাকে, অন্যটিতে দ্রুত গতির জাগরণের। অর্থাৎ একই মস্তিষ্কে একই সময়ে ঘুম ও জাগরণ দুটোই ঘটে।
কেন এই ভিন্নধর্মী ঘুমের প্রয়োজন? এর মূল কারণ লুকিয়ে আছে তাদের শারীরবৃত্তীয় গঠনে। ডলফিন স্তন্যপায়ী প্রাণী, তাদের ফুসফুস আছে কিন্তু ফুলকা নেই। ফলে নিয়মিত শ্বাস নেওয়ার জন্য তাদের পানির ওপরে উঠতে হয়। মানুষের মতো ঘুমের মধ্যেও ডলফিনের শ্বাসপ্রশ্বাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে না; বরং মাথার ওপরের শ্বাসরন্ধ্র খুলে শ্বাস নেওয়ার বিষয়টি তাদের মস্তিষ্কের প্রায় সচেতন সিদ্ধান্তের মতো। পুরো মস্তিষ্ক অচেতন হয়ে গেলে তাদের শ্বাস নেওয়ার প্রবৃত্তিটিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এই সমস্যার সমাধানেই অর্ধেক মস্তিষ্কের ঘুমের বিবর্তন। এক অর্ধেক বিশ্রামে গেলে অন্যটি শ্বাসপ্রশ্বাসের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে এবং পানির ওপরে ওঠার সময়টি নিশ্চিত করে। এমনকি সাঁতার কাটতে কাটতেই এই বিশ্রাম চলে। বন্দী ডলফিনের ওপর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, তারা দিনে প্রায় দশবার ছোট ছোট পর্বে ঘুমায়, প্রতিটি পর্ব এক ঘণ্টারও কম সময়ের। দুই গোলার্ধ মিলিয়ে সারা দিনে মস্তিষ্কের দুই পাশে প্রায় সমান বিশ্রাম হয়।
শ্বাসের পাশাপাশি নিরাপত্তার কারণেও এই কৌশল গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রে হাঙরের মতো শিকারীর উপস্থিতিতে ডলফিনের সজাগ ইন্দ্রিয়ই তার প্রধান অস্ত্র। দুই চোখ বন্ধ থাকলে বিপদ টের পাওয়ার কোনো উপায় থাকত না। জেগে থাকা অর্ধেক মস্তিষ্ক খোলা চোখ দিয়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে, কোনো বিপদের আভাস পেলেই পুরো মস্তিষ্ক তৎক্ষণাৎ সজাগ হয়ে যায়। তবে গবেষকেরা পরে আবিষ্কার করেছেন, অন্ধ ডলফিন বা সম্পূর্ণ অন্ধকার পরিবেশেও এই অর্ধেক মস্তিষ্কের ঘুম বজায় থাকে। ফলে চোখ খোলা থাকাটা আসলে ফলাফল, মূল কারণ নয়; মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ কোনো জৈবিক প্রক্রিয়াই এই চক্র নিয়ন্ত্রণ করে।
মানুষের ঘুমের দুটি প্রধান ধাপ—স্লো-ওয়েভ এবং আরইএম। আরইএম ধাপেই মানুষ স্বপ্ন দেখে। কিন্তু ডলফিনের ক্ষেত্রে আরইএম পর্যায়ের কোনো প্রমাণ মেলে না; তাদের ঘুম মূলত স্লো-ওয়েভেই সীমাবদ্ধ। এই ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের কারণে কিছু গবেষক একে আদৌ ঘুম বলতে রাজি নন; তাঁদের মতে, এটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি অবস্থা। ডলফিনের পূর্বপুরুষেরা একসময় ডাঙায় বসবাস করত, পরে জলে ফিরে গেলেও তাদের ফুসফুস ও তাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা অপরিবর্তিত ছিল। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বেচ্ছাধীন থাকায় এই অভিনব ঘুমের পদ্ধতির বিকাশ ঘটে।
এই ঘুমের কৌশলে ডলফিন একা নয়। বেলুগা তিমি, পাইলট তিমি, পরপয়েজ এবং আমাজন নদীর ডলফিনের মধ্যেও এই ধরনের ঘুম দেখা যায়। আকাশের ফ্রিগেট পাখিও দীর্ঘ উড্ডয়নের সময় একই কৌশলে বিশ্রাম নেয়। হাঁসের কিছু প্রজাতি পাহারাদারির দায়িত্ব দলের মধ্যে ভাগ করে নেয়, আর ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার গবেষকেরা প্রমাণ করেন কুমিরও ঘুমানোর সময় এক চোখ খোলা রাখে। যেসব প্রাণী এক দিনের জন্য শ্বাস নিতে ভুলে গেলে মারা যায়, তাদের জন্য সচেতনতা পুরোপুরি হারানো কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। কোন জৈব রাসায়নিক সংকেত এই ঘুমচক্র চালায় এবং কেন আরইএম ধাপটি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা।




