মহাকাশের বুকে ১০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে এমন এক সিংহের সন্ধান মিলেছে, যার নাক তৈরি একটি মৃতপ্রায় নক্ষত্র দিয়ে আর কেশর তৈরি মহাজাগতিক ধুলো দিয়ে। নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের অবলোহিত ক্যামেরায় ধরা পড়া এই বিস্ময়কর দৃশ্যটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এখন নতুন আশ্চর্যের জন্ম দিয়েছে।
এনজিসি ২৩৯২ নামে পরিচিত এই নেবুলাটিকে আদর করে ‘লায়ন নেবুলা’ও বলা হয়। এর আগে ২০০০ সালে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ প্রথম এর ছবি তুলেছিল। তবে জেমস ওয়েবের ক্যামেরায় ধরা পড়া নতুন রূপটি অনেক বেশি স্পষ্ট ও জাদুকরী, যা দেখে বিস্মিত হয়েছেন বিজ্ঞানীরাও।
নেবুলা বলতে সাধারণত মহাকাশে ছড়িয়ে থাকা গ্যাস ও ধুলোর মেঘকে বোঝানো হয়। লায়ন নেবুলা কিন্তু একটি প্ল্যানেটারি নেবুলা, যার নাম শুনে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। শত শত বছর আগে টেলিস্কোপ তেমন উন্নত ছিল না বলে এগুলোকে গ্রহের মতো গোলাকার দেখাত, আর সেই ভুল থেকেই এমন নামকরণ। আসলে এটি সূর্যের মতো মাঝারি আকারের নক্ষত্রের জীবনের শেষ পর্যায়ের দৃশ্য। আমাদের সূর্যও প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর নিভতে শুরু করলে ঠিক এমনই এক নেবুলায় পরিণত হবে।
লায়ন নেবুলার কেন্দ্রে একটি শ্বেত বামন বা মৃতপ্রায় নক্ষত্র অবস্থান করছে। এই নক্ষত্র থেকে অবিরাম বিকিরণ ছড়িয়ে পড়ছে, যার ফলে চারপাশে তৈরি হয়েছে বিশাল গ্যাসের বুদবুদ। জেমস ওয়েবের ছবিতে এই বুদবুদটিই সিংহের মুখের মতো দেখা যাচ্ছে। প্রবল শক্তির কারণে এই বিকিরণ সামনের সব ধুলোবালি ধ্বংস করে দিচ্ছে। মৃত তারার চারপাশে ধুলোর বিশাল আবরণটি সিংহের রাজকীয় কেশরের মতো দেখায়।
হাবল টেলিস্কোপ মূলত দৃশ্যমান আলোতে ছবি তোলে, তাই মহাকাশের ঘন ধুলোর মেঘ ভেদ করে বেশি গভীরে যেতে পারে না। অপরদিকে জেমস ওয়েবের স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়া বিশাল আয়না এবং শক্তিশালী ইনফ্রারেড সেন্সর রয়েছে, যা ধুলোর পর্দা সরিয়ে ভেতরের নিখুঁত ছবি তুলতে সক্ষম। নতুন ছবিতে শ্বেত বামন তারার চারপাশের আয়নিত গ্যাস ও ধুলোর মেঘ হাবলের চেয়ে বহুগুণ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। তবে কীভাবে এত জটিল বলয় ও খোলসের মতো নিখুঁত কাঠামো তৈরি হলো, তা এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে বড় রহস্য। জেমস ওয়েবের এই নতুন ডেটা সেই রহস্য সমাধানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকরা।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, মহাকাশের এই গ্যাসীয় সিংহের মৃত্যু হতে এখনো বেশ দেরি আছে। প্রায় ১০ হাজার বছর পর এর শেষ গর্জন শোনা যাবে, তারপরই চিরতরে হারিয়ে যাবে এই অপরূপ নেবুলা। তার আগ পর্যন্ত জেমস ওয়েবের তোলা ছবিতে এর ভয়ংকর সুন্দর রূপটি উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন মহাকাশপ্রেমীরা।




