সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে দীর্ঘ সময় কাটানো তরুণদের মধ্যে বয়স নিয়ে নতুন এক ধরনের দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। ইন্টারভিউ বোর্ডে বয়সের প্রশ্ন শুনে এক তরুণের উত্তর ছিল, ‘সার্টিফিকেটে ২৭, চাকরি খোঁজার ক্লান্তিতে মনে হয় ৩৭!’ এই কথাটি যেন কৌতুক নয়, বরং একটি বাস্তব চিত্রের প্রতিফলন। বছরের পর বছর প্রস্তুতি, পরীক্ষার পর পরীক্ষা এবং ফলাফলের দীর্ঘ প্রতীক্ষার মধ্যে নীরবে বেড়ে যায় বয়স।

মিরপুরের ফয়সাল আহমেদ (ছদ্মনাম) এর এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ২৮ বছর বয়সী এই তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে সাড়ে তিন বছর ধরে বিসিএস, ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়ে আসছেন। একটি পরীক্ষা শেষ হলে শুরু হয় আরেকটির প্রস্তুতি। এতে শুধু বয়সই বাড়ছে না, কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকুও হাতছাড়া হচ্ছে।

এদিকে, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) বিসিএসের ফলাফল প্রকাশে গতি এনেছে বলে জানা গেলেও, চূড়ান্ত নিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পুলিশ ভেরিফিকেশন। ফলে দ্রুত ফল প্রকাশের সুফল পাননি প্রার্থীরা। ২৩ বছর বয়সে প্রস্তুতি শুরু করা একজন প্রার্থীকে চূড়ান্ত যোগদানের সময় ২৭ বা ২৮ বছর পেরিয়ে যেতে হয়। একাধিকবার ব্যর্থ হলে বয়স ৩০ ছুঁয়ে ফেলে।

এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও তরুণদের কর্মজীবনে প্রবেশ কঠিন হয়ে উঠছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ‘এমপ্লয়মেন্ট আউটলুক ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৩ থেকে ২৯ বছর বয়সী স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর সাথে যোগ হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তির চাপ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক স্তরের অনেক চাকরি এখন প্রযুক্তির দখলে চলে যাচ্ছে। তাই নতুন কর্মীদের কাছ থেকে শুরু থেকেই উচ্চ দক্ষতা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ট্রেন্ডস ২০২৬’ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বে তরুণ বেকারত্বের হার এখনো ১২ দশমিক ৪ শতাংশ। সারা বিশ্বে প্রায় ২৬ কোটি তরুণ-তরুণী কোনো শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের আওতায় নেই। আইএলও সতর্ক করেছে, কর্মজীবনের শুরুতেই দীর্ঘ সময় বেকার থাকার ফলে ভবিষ্যতে ক্যারিয়ার ও আয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে, সরকারি চাকরির প্রতি আকর্ষণ বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে এখনো সবচেয়ে বেশি। চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং নানান সুবিধার কারণে বিসিএসসহ অন্যান্য সরকারি চাকরিতে প্রস্তুতি নিতে কয়েক বছর কাটানো অস্বাভাবিক নয়। তবে, শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি আর ভেরিফিকেশনের অপেক্ষায় না থেকে একজন তরুণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন, নতুন দক্ষতা শেখা এবং পেশাগত যোগাযোগ তৈরি করা উচিত। কারণ, শেষ পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে সফল না হলে দীর্ঘ প্রস্তুতি নেওয়া তরুণকে চাকরির বাজারে নতুন করে শুরু করতে হয়। এখন শুধু সনদ বা ডিগ্রি দিয়ে চাকরি মেলে না; প্রতিষ্ঠানগুলো কাজের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও ব্যবহারিক দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিচ্ছে।

এই সংকট মোকাবিলায় সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি পুরো ক্যারিয়ারকে একটি পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হওয়ার পর থেকেই ইন্টার্নশিপ, খণ্ডকালীন কাজ বা ছোট প্রকল্পের মাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা করা উচিত। এর পাশাপাশি ডেটা বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, ডিজিটাল যোগাযোগের মতো প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনও জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বয়সের একটি সীমা ঠিক করে নেওয়া এবং সরকারি চাকরির পাশাপাশি বিকল্প ক্যারিয়ারের প্রস্তুতিও রাখা। ফয়সালের মতো তরুণদের জন্য প্রশ্নটি এখন ‘কবে চাকরি হবে’ না, বরং ‘চাকরি পাওয়ার আগের সময়টাকে কীভাবে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়’। দীর্ঘ অপেক্ষা বা পরীক্ষায় সাময়িক ব্যর্থতা ক্যারিয়ারের পথে বাধা হতে পারে না; কিন্তু দক্ষতা না অর্জন করে নিষ্ক্রিয় থাকলেই সেই অপেক্ষাই জীবনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।