বিশ্বব্যাংকে দুই বছর ধরে প্রস্তাব উপস্থাপনের পর যে প্রত্যাখ্যান জেমস চেনকে বদলে দিয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি শিখেছেন সাফল্যের আসল পাঠ। বিশ বছর আগে ২.২ বিলিয়ন মানুষের চোখের সমস্যা সমাধানের একটি পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বিশ্বব্যাংকে গিয়েছিলেন। তার ধারণা ছিল, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য সামঞ্জস্যযোগ্য পাওয়ার লেন্সই যুগান্তকারী সমাধান। কিন্তু বিশ্বব্যাংক সেটি প্রত্যাখ্যান করে। এই ব্যর্থতাকে তিনি পরাজয় নয়, বরং নতুন পথের সূচনা হিসেবে দেখেছেন।

হতাশ না হয়ে চেন রুয়ান্ডায় 'ভিশন ফর আ নেশন' নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন। সেসময় চোখের যত্ন বিশেষজ্ঞরা মনে করতেন, রুয়ান্ডার মতো দেশে জাতীয় পর্যায়ে এমন কর্মসূচি সম্ভব নয়। কিন্তু চেন নিজেই সম্পূর্ণ আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে ২,৭০০ স্থানীয় নার্সকে প্রশিক্ষণ দেন এবং দেশটির ১৫,০০০ গ্রামে স্ক্রিনিং পরিচালনা করেন। ফলে রুয়ান্ডাই বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে সাশ্রয়ী মূল্যে চোখের চিকিৎসার সার্বজনীন সুযোগ পায়। এই সাফল্যের পেছনে ছিল ব্যর্থতাকে মেনে নেওয়ার সাহস এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মানসিকতা।

জনহিতকর কাজের বিচার এখন কেবল উদ্দেশ্য দিয়ে হয় না, ফলাফল দিয়েই হয়। প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনবিশ্বাস যখন ক্ষয়িষ্ণু, তখন এই যাচাই আরও কঠোর হয়েছে। অনেক ধনী ব্যক্তি নিজের নামে হাসপাতালের শাখা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দান করে খ্যাতি কুড়োতে চান, কিন্তু চেনের মতে, এ ধরনের 'নিরাপদ' দান প্রকৃত পরিবর্তন আনে না। বরং জনহিতকর কাজের আসল শক্তি হলো ঝুঁকিপূর্ণ, উদ্ভাবনী প্রকল্পে বিনিয়োগ করা — যেখানে সরকার বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো শেয়ারহোল্ডার বা করদাতার চাপ থাকে না। এই স্বাধীনতাই একজন দাতাকে ব্যর্থতার খরচ বহন করার এবং সফল হলে তার সুফল সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ দেয়।

চেনের 'মুনশট মেন্টালিটি' ধারণাটি বাস্তবায়িত হয়েছে ক্লিয়ারলি ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে। ভারতের আসামে চা-পাতা তোলা শ্রমিকদের নিয়ে করা একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, চশমা ব্যবহারের ফলে তাদের দৈনিক উৎপাদনশীলতা ২১.৭ শতাংশ বেড়েছে। এই প্রমাণের ভিত্তিতে জাতিসংঘ ২০২১ সালে ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাস করে, যেখানে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য চোখের যত্ন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। এই সাফল্যই দেখায়, ধৈর্য ও ঝুঁকি নিয়ে কোনো ধারণা প্রমাণ করলে তা বড় পরিসরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

বর্তমানে বিশ্বে বিশাল সম্পদ হস্তান্তরের সময় চলছে। ২০৪৮ সালের মধ্যে ১২৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ নতুন প্রজন্মের হাতে যাবে। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও এআই বিনিয়োগকারীরা অভূতপূর্ব গতিতে সম্পদ তৈরি করছেন, আর তাদের মধ্যে উদ্যোক্তা মনোভাব ও ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতাও রয়েছে। চেনের আহ্বান, এই নতুন প্রজন্ম যেন তাদের উদ্ভাবনী দক্ষতা জনহিতকর কাজে ব্যবহার করে। তাদের এই ভূমিকাই নির্ধারণ করবে আধুনিক যুগে একজন 'ভালো বিলিয়নিয়র' কেমন হবে। ব্যক্তিগত মূলধনের এই অনন্য শক্তিকে যদি সঠিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কাজে লাগানো যায়, তবেই বিশ্বের সবচেয়ে জটিল সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।