বর্তমান যুগের মানবসম্পর্ক নিয়ে একটি গভীর পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে এক বিশ্লেষণধর্মী লেখায়। লেখায় বলা হয়েছে, আমরা যেন কেবলই পরস্পরের মাঝে প্রাচীর তুলছি, সেতু নির্মাণে ব্যর্থ হচ্ছি। দিন দিন ব্যক্তিগত, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক—সব ক্ষেত্রেই এই বিভাজনরেখা ক্রমশ প্রশস্ত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, বিভেদ আর শত্রুতাই যেন মানবজীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এই শত্রুতা মানুষের অস্তিত্ব গঠনের প্রধান শর্তে পরিণত হচ্ছে।
ফরাসি চিন্তাবিদ রনে জিরারের একটি বক্তব্যের উল্লেখ করে লেখক দেখিয়েছেন, মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব একপর্যায়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে একে অপরকে হত্যা করাই একমাত্র পথ হয়ে ওঠে—হয় সে আপনাকে খুন করবে, না হয় আপনি তাকে। এই খুনোখুনি শুধু আক্ষরিক অর্থেই নয়, রূপক অর্থেও ঘটে থাকে। যখন আমরা কারও দিকে তাকাতেই পারি না, তখনও তা এক ধরনের মানসিক হত্যারই সামিল।
লেখায় একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উল্লেখ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সময় এক শিক্ষার্থীর বাবা-মা তাঁকে তাদের ছেলেকে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। একদিন পড়াতে গিয়ে তিনি টেবিলের পাশে একটি ক্রিকেট স্টাম্প দেখতে পান। ছেলেটি জানায়, এটি তার পিতাকে আঘাত করার জন্য রাখা হয়েছে। এই ঘটনা থেকে প্রশ্ন উঠেছে—পারিবারিক দ্বন্দ্বের জন্য কি শুধু সন্তানই দায়ী, নাকি পরিবার ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশও এর জন্য সমানভাবে দায়ী?
পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটির ভেতরেও যে প্রতিনিয়ত এমন সংঘাত চলছে, তা স্বীকার করে লেখক বলেছেন, অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মাঝেও এমন বিরাট প্রাচীর গড়ে ওঠে যে সেটি সপ্তম আকাশ ছুঁয়ে যায়। সংবাদপত্রে প্রকাশিত আত্মহত্যার খবরগুলোতে প্রায়ই এই বিশাল ব্যবধানই কারণ হিসেবে দেখা যায়। তবে একমাত্র দ্বন্দ্বই যে এর কারণ নয়, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা আর্থসামাজিক পরিস্থিতিও দায়ী হতে পারে। দেশে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও বড় প্রশ্ন হলো—যেসব বিয়ে টিকে আছে, সেগুলো কেমন করে টিকে আছে? কারণ, টিকে থাকা বিষাক্ত সম্পর্ক শিশুদের মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক বলেছেন, বিয়ে মূলত এক ধরনের আলাপ। যে আলাপে ক্লান্তি নেই, সেই সম্পর্কই আদর্শ। কিন্তু বাস্তবে কি সেই সংলাপের জায়গা তৈরি হয়? আমরা কি কারও কথা সত্যিই শুনি? নাকি মনোলগই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে উঠেছে? রাস্তায় কোনো বিষণ্ন বা অসুস্থ মানুষকে দেখলে তার কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে প্রায়ই দুটি প্রতিষ্ঠানের কথা মনে পড়ে—পরিবার ও কর্মস্থল। শহরের মানুষ জীবনের প্রায় পুরোটা সময় এই দুই জায়গাতেই কাটায়, অথচ এখানেই সম্পর্কগুলো শত্রুতার দিকে ধাবিত হয়ে ব্যক্তিকে ভেতর থেকে শূন্য করে দেয়, ফলে তার শরীরে বাসা বাঁধে নানা রোগ।
দেশের রাজনীতির চিত্রও একই রকম। এখানেও সংলাপের বদলে খুনোখুনির প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কে কাকে খুন করে নিজের টিকে থাকা নিশ্চিত করবে, তা-ই যেন রাজনীতির মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এই অনন্ত দ্বন্দ্ব ঠেকাতে রনে জিরারের মতে একমাত্র পথ হলো আত্মত্যাগ (স্যাক্রিফাইস)। কিন্তু ক্ষোভের এই পরিবেশে কি কেউ সেই আত্মত্যাগে রাজি হবে? ক্রমে আমরা এমন অবস্থায় পৌঁছে যাই যে, 'স্যাক্রিফাইস' শব্দটিই আমাদের কাছে অপরিচিত হয়ে ওঠে।
এই সংঘাত ও সংলাপহীনতার সবচেয়ে ভয়াবহ ফল হলো একটি ট্রমাক্রান্ত পরিবেশ সৃষ্টি। মনোবিশারদ সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুযায়ী, এই ট্রমা মানুষের অচেতন মনে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে এবং 'রিপিটেশন কম্পালশন' বা ট্রমার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে সারাজীবন তাকে আক্রান্ত করে। ফ্রয়েড তাঁর 'বিয়ন্ড দ্য প্লেজার প্রিন্সিপাল' গ্রন্থে ষোড়শ শতকের ইতালীয় কবি তোরকোয়াতো তাসোর 'জেরুজালেম ডেলিভারড' কাব্যের উদাহরণ দিয়েছেন। কাব্যে ক্রুসেড যোদ্ধা টানক্রিড তার প্রেমিকা ক্লোরিন্ডাকে চিনতে না পেরে যুদ্ধের ময়দানে হত্যা করে। পরবর্তীতে একটি বনে গাছের ওপর আঘাত করলে গাছ থেকে রক্ত বেরিয়ে আসে এবং ক্লোরিন্ডার কণ্ঠস্বর শোনা যায়—'তুমি আমাকে দ্বিতীয়বার খুন করলে!' ফ্রয়েডের মতে, ট্রমাগ্রস্ত মানুষ মনে করে তার কপাল খারাপ, কিন্তু আসলে তার অচেতন মন তাকে আগের টক্সিক সম্পর্কের দিকেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
আমাদের পরস্পরের মধ্যে রচিত এই প্রাচীর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে সন্তানদের। তাদের মনে বিশাল এক ট্রমা তৈরি হচ্ছে, যার পুনরাবৃত্তি হিসেবে তারা নানা ধরনের বিকৃত আচরণ প্রদর্শন করছে। কিন্তু সমাজ এই বিকৃতির মূল কারণ অনুসন্ধান না করে বরং তাদের বিচ্ছিন্ন বা সমাজচ্যুত করতে চায়। এভাবে আরও বেশি বিকৃতি সৃষ্টি হওয়া ঠেকানো যাবে কি না, সেই প্রশ্নই লেখাটির শেষ বক্তব্য।




