একটি সময় ছিল যখন ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করা হতো। ভারী স্কুলব্যাগের পরিবর্তে ট্যাবলেট, খাতার বদলে ল্যাপটপ আর ব্ল্যাকবোর্ডের স্থানে স্মার্ট স্ক্রিন—এই কল্পনাকে ভবিষ্যতের শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করেছিল বিশ্বের অনেক দেশ। কিন্তু সেই পথে হাঁটতে গিয়েই এখন নতুন কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। প্রযুক্তি কি সত্যিই শেখাকে সহজ করেছে, নাকি এর ফলে অপরিহার্য কিছু দক্ষতা হারিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ পুনরায় বই, খাতা আর কলমের দিকে ঝুঁকছে।

শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন করে ভারসাম্য আনার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফ্রান্স ও ইতালিতে। তারা প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ বাদ না দিলেও ছোট শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে ছাপা বই, হাতের লেখা ও কাগজ-কলমের ব্যবহারে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, সুইডেন ইতোমধ্যে স্কুলগুলোতে ছাপা পাঠ্যবইয়ের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির শিক্ষামন্ত্রীর মতে, শিশুদের শেখার কাজে ভালো মানের বই এখনও অত্যন্ত জরুরি। ডেনমার্কও একই পথে হাঁটছে। স্কুলগুলোতে মোবাইল ফোন ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ চালু করার পাশাপাশি নতুন বই কেনার জন্য বিপুল বিনিয়োগ করছে তারা। নরওয়ে ছোট শিক্ষার্থীদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কিছু শিক্ষাসহায়ক ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। তাদের মূল লক্ষ্য, শিশুরা যাতে প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে।

শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিননির্ভর শিক্ষার ফলে অনেক শিশুর মনোযোগ ধরে রাখার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি বড় লেখা পড়ে বোঝা, তথ্য মনে রাখা এবং গভীরভাবে চিন্তা করার দক্ষতাও কিছু ক্ষেত্রে আগের চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ডিজিটাল স্ক্রিনে পড়ার সময় নোটিফিকেশন, ভিডিও বা নতুন বার্তার কারণে মনোযোগ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। অন্যদিকে একটি ছাপা বই পাঠককে অনেক বেশি সময় একই বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।

হাতের লেখার অভ্যাস শুধু লেখার সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এটি মস্তিষ্কের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যখন শিশু নিজের হাতে কোনো শব্দ লেখে, তখন চোখ, হাত ও মস্তিষ্ক একসাথে কাজ করে। প্রতিটি অক্ষর তৈরি করার সময় মস্তিষ্ক তথ্যকে আরও গভীরভাবে প্রক্রিয়াজাত করে। ফলে শেখা বিষয়টি দীর্ঘস্থায়ী হয়। কিবোর্ডে টাইপ করার সময় একই ধরনের আঙুলের নড়াচড়া বারবার পুনরাবৃত্তি হয়, যার ফলে তথ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া তুলনামূলক কম সক্রিয় হয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এটি প্রযুক্তির বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নয়। ডিজিটাল দক্ষতা বর্তমান বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রেও এর বিকল্প নেই। কিন্তু প্রযুক্তি কখন ব্যবহার করা উপযুক্ত আর কখন বই-খাতা বেশি কার্যকর— সেই ভারসাম্য নির্ধারণ করাই এখন চ্যালেঞ্জ। শিশুরা যাতে একদিকে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শেখে, অন্যদিকে মনোযোগ, বিশ্লেষণী চিন্তা, কল্পনাশক্তি ও লেখার অভ্যাসও গড়ে তোলে, সেটাই এখন ইউরোপের বহু দেশের লক্ষ্য।

অভিভাবকদের কাছে এটি সম্ভবত চেনা একটি দৃশ্য— যখন একটি শিশু স্ক্রিনের দিকে তাকানো ছেড়ে বই নিয়ে বসে, তখন চারপাশ শান্ত হয়ে যায়। নোটিফিকেশনের কোন শব্দ নেই, নেই ভিডিওর টান। থাকে শুধু গল্প, কল্পনা আর মনোযোগ। ডিজিটাল যুগের মাঝেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তাই আবার বুঝতে পারছে যে শেখার সবচেয়ে শক্ত ভিত এখনও গড়ে ওঠে একটি বই, একটি খাতা আর নিজের হাতে লেখা কয়েকটি শব্দের মাধ্যমেই। প্রযুক্তি ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিলেও সেই ভবিষ্যতের ভিত গড়ে উঠতে পারে কাগজের পাতায় লেখা ছোট্ট একটি বাক্য থেকেই।