সরকারি কলেজে কর্মরত ১৪৫ জন বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শককে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের প্রভাষক পদে পদোন্নতি ও পদায়ন দেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অধীন সরকারি কলেজগুলোর এই কর্মকর্তাদের সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নবম গ্রেডে উন্নীত করা হয়। প্রজ্ঞাপনটি ২০ জুলাই প্রকাশিত হয়। এর আগে ২০১৫ সালে আরেকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিজ্ঞান বিষয়ের প্রদর্শকদের ক্যাডার পদোন্নতির কোটা ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ এবং পরবর্তীতে ১০ শতাংশ করা হয়। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট রুলস সংশোধন করে এই কোটা বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

আইনগতভাবে এই পদোন্নতি বৈধ হলেও এর ন্যায়সংগততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিসিএস ক্যাডারে প্রবেশের জন্য লাখ লাখ তরুণকে কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। সেই পথকে বাইপাস করে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সরাসরি ক্যাডারভুক্তি মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে, পদোন্নতিপ্রাপ্ত প্রদর্শকদের মধ্যে অনেকের প্রথম পদায়নই হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় কলেজগুলোতে। যেমন, পদার্থবিজ্ঞান বিষয় থেকে পদোন্নতি পাওয়া ৩০ কর্মকর্তা ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, কারমাইকেল কলেজ ও রংপুর সরকারি কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানে সরাসরি পদায়ন পেয়েছেন। অথচ নিয়মিত বিসিএসের মাধ্যমে আসা ক্যাডার শিক্ষকদের প্রত্যন্ত এলাকায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়।

এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। নিয়মিত বিসিএসের মাধ্যমে আসা শিক্ষকেরা মনে করছেন, তাঁদের মেধা ও প্রচেষ্টার অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। অনেককে কাঙ্ক্ষিত পদ ও পদায়নের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যেখানে প্রদর্শকেরা সহজেই অভিজাত প্রতিষ্ঠানে চলে গেছেন। এছাড়া বেসরকারি এমপিওভুক্ত কলেজের প্রদর্শকদের জন্য এ ধরনের কোনো সুযোগ নেই—সেখানে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকেরা প্রভাষক পদে পদোন্নতি পান না। সরকারি কলেজের ক্ষেত্রে এই দ্বিচারিতাও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রদর্শকদের কাজ বিজ্ঞানাগার পরিচালনা ও ব্যবহারিক ক্লাসে সহায়তা করা। তাঁদের জন্য আর্থিক ও প্রশাসনিক উন্নতির পথ নিশ্চিত করা জরুরি হলেও, ক্যাডার সার্ভিসের বাইরে থেকেও তা সম্ভব বলে মত দিচ্ছেন অনেকে। কারণ, বিসিএস ক্যাডারে সরাসরি প্রবেশের একাধিক পথ থাকলে প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ভিত্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ বিসিএসকে তাঁদের ক্যারিয়ারের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখে। এই সিদ্ধান্ত তাঁদের সেই প্রত্যাশা ও আস্থার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শিক্ষা ক্যাডারের ভেতর থেকে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপেরও সম্ভাবনা রয়েছে। বিসিএস ক্যাডারভুক্ত অনেক সদস্য ইতিপূর্বে বিভিন্ন কোটা ও পদোন্নতি সংক্রান্ত বিষয়ে আদালতে গেছেন। বর্তমান সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশাসনিক জটিলতা ও মামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।