হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় খোয়াই নদের একটি বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে কালীগঞ্জ-চরহামুয়া এলাকায় নদের ডান তীরের প্রায় ৩০০ ফুট অংশ ভেঙে যায়। এর কিছুক্ষণের মধ্যে নদের পানি আশপাশের গ্রামগুলোতে ঢুকে পড়ে। তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো নিম্নাঞ্চলের বহু বাড়িতে দুই থেকে আড়াই ফুট পানি জমে আছে। উঁচু এলাকার পানি কিছুটা কমলেও বন্যাকবলিত এলাকায় আজ থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে।

কালীগঞ্জ, চরহামুয়া, বনগাঁও, সুঘর, বৈদ্যেরবাজারসহ অন্তত ২৫টি গ্রামের অধিকাংশ ঘরবাড়ি পানির নিচে। লস্করপুর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে এখনো ঘরের ভেতর পানি। অনেক পরিবার খাটের ওপর বসবাস করছে। রান্না, বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ এবং শৌচাগার ব্যবহার চরম কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

হবিগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে জানান, এ পর্যন্ত ৩০ হাজার মানুষ ও ৬ হাজার ৪০০ পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৬০০টি শুকনা খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ৩০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেন, ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

সুঘর গ্রামের বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী হেমেন্দ্র দাস বলেন, ‘এত কষ্ট আগে কখনো সহ্য করিনি। ঘরজুড়ে পানি, রান্না করা অসম্ভব। খাটের ওপর কোনোমতে দিন কাটছে। খাবার শেষের পথে। শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির জরুরি প্রয়োজন।’

চরহামুয়া গ্রামের জাহিদা খাতুন (৭০) কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, নদীর বাঁধ ভেঙে পানি এলে তারা বুঝে উঠতে পারেননি। মুহূর্তের মধ্যে বাড়ি তলিয়ে যায়। ঘরের ভেতর পানি থাকায় রাতে ঘুম হয় না। খাবার ও ওষুধের অভাবে অসহায় অবস্থায় দিন কাটছে।

সিরাজ মিয়া (৬৫) নামের বনগাঁও গ্রামের আরেক বাসিন্দা জানান, তাদের ঘরে প্রায় আড়াই ফুট পানি। গরু-ছাগল নিরাপদ স্থানে সরাতে হয়েছে। জমির ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। পানি দ্রুত না নামলে আরও বিপুল ক্ষতির আশঙ্কা।

হবিগঞ্জ-ধুলিয়াখাল-মিরপুর আঞ্চলিক সড়কে টানা তিন দিন যান চলাচল বন্ধ ছিল। আজ থেকে সীমিত পরিসরে যান চলাচল শুরু হয়েছে।

বাঁধ ভাঙার কারণ সম্পর্কে জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভায় বলা হয়, বাঁধসংলগ্ন এলাকা থেকে ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ে। নদীতে পানি চাপ বেড়ে গেলে তা ভেঙে যায়। জেলা প্রশাসক জি এম সরফরাজ জানান, ভাঙনের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভাঙা বাঁধ আগামীকাল সোমবার থেকে মেরামত শুরু হবে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর নদের পানির চাপ কিছুটা কমলেও পানি নামার গতি ধীর। এখনো ভাঙা অংশ দিয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকছে। বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় বাঁধ আরও ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা করছেন তারা।