মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে গত শনিবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হলো ‘জোহরা: দুঃসময়ের কান্ডারি’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্রটির প্রিমিয়ার প্রদর্শনী। নির্মাণ করেছেন তরুণ চলচ্চিত্রকার সন্দীপ কুমার মিস্ত্রী, যিনি নিজেই চিত্রনাট্য রচনা ও পরিচালনা করেছেন। তত্ত্বাবধানে ছিলেন খ্যাতিমান নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল। সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের সন্তান—শারমিন আহমদ রিপি, সিমিন হোসেন রিমি, মাহজাবিন আহমদ মিমি ও তানজিম আহমদ সোহেল তাজ—যৌথভাবে প্রামাণ্যচিত্রটি প্রযোজনা করেছেন।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে বাচিক শিল্পী নায়লা তারান্নুম কাকলি ‘তাজউদ্দীনের শার্ট’ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুঃসময়’ কবিতা দুটি আবৃত্তি করেন। এছাড়া মেহেরুন সুলতানা দুটি গান পরিবেশন করেন। সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন তানভীর মোকাম্মেল।

প্রদর্শনী শুরুর আগে দর্শকদের স্বাগত জানিয়ে সন্তানদের মধ্য থেকে শারমিন আহমদ মায়ের জীবনের নানা অজানা দিক তুলে ধরেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। স্কুল-কলেজ জীবনে তিনি দারুণ সাঁতারু ও অ্যাথলেট ছিলেন। হাওয়াইয়ান গিটার বাজানোয় তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল, শিখেছিলেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে। সেই সময় ‘উদয়ের পথে’ শিরোনামে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর লেখা ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। বিয়ের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং একইসঙ্গে হোমিও চিকিৎসা শিক্ষাও সম্পন্ন করেন। কাপাসিয়ার গ্রামের বাড়িতে দরিদ্র মানুষদের তিনি বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতেন। উল বুননের কাজেও ছিল তাঁর অসাধারণ নৈপুণ্য। দ্রুত সোয়েটার তৈরিতে তিনি পারদর্শী ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কলকাতায় বহু সোয়েটার বুনে শরণার্থীশিবিরে বিতরণ করেছিলেন।

এরপর মাকে স্মরণ করে আবেগঘন বক্তব্য রাখেন সোহেল তাজ। তিনি জানান, বাবা তাজউদ্দীন আহমদের মৃত্যুর পর তাঁদের পরিবার গভীর অর্থসংকটের মুখে পড়েছিল। শৈশবে একটি খেলনা বা সাইকেলের জন্য তাঁর যে আকুতি ছিল, তা মায়ের জন্য কষ্টকর স্মৃতি হিসেবে থেকে গেছে। বাবা তাজউদ্দীন আহমদের মরদেহ বাড়িতে আসার পর সাংবাদিকরা জোহরা তাজউদ্দীনের কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি স্বামী হারিয়েছি, আমার সন্তানেরা তাদের বাবাকে হারিয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশ কী হারাল, সেটি উপলব্ধি করতে হবে।’ সোহেল তাজের কণ্ঠ আবারও বাষ্পরুদ্ধ হয়ে ওঠে এই স্মৃতিচারণের সময়।

ঘণ্টাবিশেষের (এক ঘণ্টা বিশ মিনিট) প্রামাণ্যচিত্রটিতে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের ব্যক্তিজীবন, রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংগঠনিক দক্ষতার পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গও স্থান পেয়েছে। এটি তাঁর মানবিকতার সেই দিকগুলো সামনে নিয়ে এসেছে, যা পূর্বে রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের আড়ালে চাপা পড়েছিল।