ঢাকা থেকে কলম্বোগামী ফিটস এয়ারের ফ্লাইট ৮ডি ০৯১২-এ কারিগরি ত্রুটির কারণে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে থাকার ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে এয়ারলাইন কর্তৃপক্ষ ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ জানিয়েছেন, ফ্লাইটটি ছাড়ার সময় রাত ২টা ১৫ মিনিট থাকলেও হাইড্রোলিক ফ্লুইড লেভেল কমে যাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে উড়োজাহাজটি কলম্বোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এ সময় ১৮২ জন যাত্রীকে উড়োজাহাজের ভেতরেই অবস্থান করতে হয়েছে। তাঁর দাবি, সকাল ৬টায় যাত্রীদের জন্য হালকা নাশতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং ভোগান্তি নিয়ে কোনো পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে ফিটস এয়ারের পক্ষ থেকে নাম না প্রকাশ করা এক মুখপাত্র দাবি করেন, ফ্লাইটটি মাত্র ৪৫ মিনিট দেরিতে ছেড়েছিল। তিনি রানওয়ে সংস্কার, বৈরী আবহাওয়া ও বিমান চলাচল সতর্কতাকে দেরির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। যাত্রীদের সঙ্গে অপেশাদার আচরণ ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন এবং বলেন, যাত্রী ও মালামাল নামানোর প্রক্রিয়ায় বিমানবন্দর থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।

তবে যাত্রীদের ভাষ্য এই বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। কলম্বো পৌঁছানোর পর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যাত্রী সোনিয়া রিফাত জানান, শুরু থেকেই ছিল চরম বিশৃঙ্খলা। ফ্লাইটে ওঠার পর সমস্যার কথা জানানো হলেও দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা না থাকায় যাত্রীদের জিম্মি করে রাখা হয়। তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে তিনি বারবার বিমান থেকে নামার অনুমতি চাইলেও তা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় কোনো খাবার না থাকায় শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের অবস্থা সংকটজনক হয়ে ওঠে। যাত্রা বাতিল করতে চাইলে এক সতীর্থের মুখের ওপর জোর করে ব্যাগ ছুড়ে মারা হয় বলে অভিযোগ তাঁর। শ্রীলঙ্কায় পৌঁছানোর পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। এই ঘটনার পর তাঁর প্রতিষ্ঠান গো-গার্লসের পক্ষ থেকে ফিটস এয়ারের সঙ্গে আর কোনো সফর না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মেহরীন রহমান নামের আরেক যাত্রী জীবনের প্রথম একক ভ্রমণের এই অভিজ্ঞতাকে ‘বিভীষিকা’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় কোনো রিফ্রেশমেন্ট ছাড়াই বসে থাকা যাত্রীদের জন্য অসহনীয় ছিল। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি ছিল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এয়ারলাইন্সের কোনো ধরনের মানবিক সহায়তা না থাকায় তিনি কলম্বো না গিয়ে ফ্লাইট থেকেই নেমে যান।

বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক যদিও বলেছেন যে তারা ভোগান্তির কোনো অভিযোগ পাননি, তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে যাত্রীদের সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা উড়োজাহাজের ভেতরেই থাকতে হয়েছে। উড্ডয়নের ঠিক আগমুহূর্তে প্রকৌশলীরা বিমানটি পরীক্ষা করে হাইড্রোলিক ফ্লুইড লেভেলে ত্রুটি খুঁজে পান এবং বিমানটিকে উড্ডয়নের অনুপযোগী ঘোষণা করেন। মার্কিন পরিবহন দপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে চার ঘণ্টার বেশি যাত্রীদের টারমাকে আটকে রাখা যায় না। এই ঘটনায় যাত্রীদের সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছিল।

ফিটস এয়ারের মুখপাত্র ‘রানা’ দাবি করলেও ফ্লাইটের যাত্রীদের তোলা ছবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাত ২টা ১৫ মিনিটের ফ্লাইটটি সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে ছেড়েছে। ফলে ৫ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট ধরে যাত্রীরা বদ্ধ বিমানেই অবস্থান করছিলেন। এ ঘটনায় এয়ারলাইন্সের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী যাত্রীরা। তারা বলছেন, ভবিষ্যতে যেন কোনো যাত্রী এ ধরনের ভোগান্তির শিকার না হন, সে জন্য শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।